যাকাত সম্প্রসারণ কার্যক্রম

যাকাত বিতরণ নিয়ে ইসলামের যা বিধান

পবিত্র মাহে রমযানের শেষ দিকে প্রতি বছরই একই মর্ম ঘটনার শোক আর ক্ষোভ মানুষকে ঘিরে নিচ্ছে। যাকাত নিতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন নিরণ্ন হত দরিদ্র মানুষ। গতকাল প্রভাতে ময়মনসিংহে যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে নারী ও শিশুসহ ২৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনা পুরো জাতিকে বেদনা-বিক্ষোভে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আলোচনার মূল বিষয়ই এখন এভাবে কি যাকাত প্রদান ইসলাম সম্মত। এই যাকাত প্রদান হলো ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। যাকাত হচ্ছে বিত্তবানদের ধন-সম্পদের সেই অপরিহার্য অংশ যা সম্পদ ও আত্মার পবিত্রতা বিধান, সম্পদের ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং সর্বোপরি আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত খাতে ব্যয় করা হয়। যাকাত হচ্ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার একটি অনুপম সমাধান। যাকাত দ্বীনের এমন রুকন যা অস্বীকার করা কুফরী। যাকাত হলো গরিবের হক। যা সম্পদশালীর কাছে আমানত। যাকাত প্রদানে একটি বিশেষত্ব এই যে, এটি গোপনে দেয়ার ব্যাপারে উত্সাহী করা হয়েছে।

মাহে রমজান যাকাত আদায়ের উপযুক্ত মৌসুম

ইসলামে রমজান মাসে সিয়াম সাধনাকে দেহের যাকাতস্বরূপ বলা হয়েছে। রমজান মাসে রোজা পালন করলে যেমন সারা শরীর পবিত্র হয়ে যায়, তেমনি মাহে রমজানে কড়ায়-গণ্ডায় যাকাত আদায় করলে মানুষের উপার্জিত সব সম্পদ পবিত্র হয় এবং অধিক সওয়াব হাসিল করা যায়। এই যাকাত দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রমজান মাসই যাকাত আদায়ের সর্বোত্তম সময়। সিয়াম পালন করে রোজাদারেরা পরস্পরের প্রতি সহমর্মী ও সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন। ফলে বিত্তবানেরা দান-সাদকা ও যাকাত-ফিতরা প্রদানে উত্সাহিত হন। রমজান মাসে যেকোনো ধরনের দান-সাদকা করলে অন্য সময়ের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি নেকি হাসিল হয়। যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একটি নফল ইবাদত করেন, তবে তিনি মাহে রমজানে একটি ফরজ ইবাদতের সমান সওয়াব পাবেন। যিনি একটি ফরজ আদায় করবেন, তিনি অন্যান্য মাসের ৭০টি ফরজের সমান সওয়াব পাবেন। তাই রমজান মাসে রোজাদার মুমিন বান্দারা একসঙ্গে গরিবে হক যাকাত ও ফিতরা আদায়—এ দুটি আর্থিক ইবাদত করে থাকেন। রমজান মাসে সমাজের ধনী লোকের যাকাত-ফিতরা বা দান-সাদকা প্রদান করুণার বিষয় নয়, এগুলো হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক।

সদকাতুল ফিতর

আ ল্লাহ রাব্বুল আলামীন রমজান সমাপনান্তে ঈদুল ফিতরের দিন ছাহেবে নেছাব অর্থাত্ ধনী ব্যক্তিদের প্রতি একটি নির্দিষ্ট সদকা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। এটিই সদকায়ে ফিতর নামে পরিচিত। রমজানের রোজার মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনরূপ ভুল ত্রুটি হলে, তা সংশোধনপূর্বক রোজাকে বিশুদ্ধ করার জন্যে সদকায়ে ফিতরের গুরুত্ব ও তাত্পর্য অপরিসীম। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, সদকায়ে ফিতর আদায় না করা পর্যন্ত বিত্তবান রোজাদারদের রোজা আসমানে লট্কানো অবস্থায় থাকে। তা আল্লাহর কবুলিয়াতের দরজায় পৌঁছাতে পারে না। সদকায়ে ফিতর আদায় করার সঙ্গে তা আল্লাহর দরবারে উপনিত হয়।

যাকাতের মাসায়িল

ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হল যাকাত। যাকাত হচ্ছে ধনীর সম্পদে গরিবের হক। ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূর করতে যাকাতের ভূমিকা অপরিসীম। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকাতের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন, “তোমরা নামাজ কায়েম কর ও যাকাত দাও। আর তোমরা নিজের জন্য যে ভালো কাজ আগেভাগে করবে তার সওয়াব ও পুরস্কার আল্লাহর কাছে পাবে।” (সূরা বাকারা, আয়াত ১১০)

ধনীদের জন্য জাকাত ফরজ

ইসলামে প্রতিটি অবস্থাপন্ন মুমিনের জন্য জাকাত আদায় একটি অবশ্য কর্তব্য বা ফরজ বলে বিবেচিত। জাকাত ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। জাকাত আদায় যাদের জন্য ফরজ তারা তা আদায় না করলে পরকালে তাদের কঠিন সাজার সম্মুখীন হতে হবে। পবিত্র কোরআনে সালাত বা নামাজ আদায়ের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে জাকাত আদায়ের কথা বলা হয়েছে। অবস্থাপন্ন মুমিনদের জন্য জাকাত আদায় যে বাধ্যতামূলক তা বুঝাতে যাকাতের কথা বার বার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামী বিধান অনুসারে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ বা সঞ্চয় থাকলে জাকাত আদায় বাধ্যতামূলক

গ্রামে বাড়ছে টাকার প্রবাহ চাঙ্গা হচ্ছে অর্থনীতি

রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এই টাকার বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে ভোগবিলাসে। আর কিছু অংশ বিনিয়োগ হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পভিত্তিক উৎপাদন খাতে। রোজার আগ থেকেই দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাড়তে শুরু করেছে। আর এর বড় অংশই যাচ্ছে গ্রামে। এদিকে অর্থবছর শেষ পর্যায়ে হওয়ায় সরকারি খাতের বরাদ্দ অর্থ খরচ করার ধুম পড়েছে। এর একটি বড় অংশও যাচ্ছে গ্রামে। সরকারি-বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতনের একটি অংশ ইতিমধ্যে গ্রামে চলে গেছে। বেতন-বোনাসের আরও একটি বড় অংশ ঈদের আগেই যাবে গ্রামে। ঈদ ও রোজার বাড়তি খরচ মেটাতে কৃষকের ঘরে মজুদ ধান বা অন্যান্য ফসলের একটি অংশ এখন বিক্রি করা হচ্ছে। রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলের আম-লিচু বিক্রির টাকাও যাচ্ছে ওই অঞ্চলের গ্রামগুলোতে। অর্থবছরের শেষ সময় হওয়ায় কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি টাকা বিতরণ করতে হচ্ছে। এছাড়া রাজনীতিবিদদের নানা কর্মসূচির কারণেও গ্রামে টাকার প্রবাহ রাড়ছে। সব মিলে নানাদিক থেকে অর্থ আসায় গ্রামের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠছে।

সম্পদ পরিশুদ্ধ ও দারিদ্র্য বিমোচন করে যাকাত

যাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। এটি ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম উপাদান। কোরআনে কারীমের ৩০টি আয়াতে যাকাতের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি আয়াতে নামাজের সঙ্গে সঙ্গে এবং দুটি আয়াতে স্বতন্ত্রভাবে।

যাকাত শব্দটির অর্থ পবিত্রকরণ, পরিশুদ্ধকরণ, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ইত্যাদি। আর ইসলামী পরিভাষায়- ধনীদের সম্পদে আল্লাহর নির্ধারিত দেয় অংশ যাকাত। বস্তুত যাকাত হচ্ছে সম্পদশালীদের সম্পদে আল্লাহ নির্ধারিত সেই ফরয অংশ যা সম্পদ ও আত্মার পবিত্রতা অর্জন, সম্পদের ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় নির্ধারিত খাতে ব্যয় বণ্টন করার জন্য দেয়া হয়।

সদকাতুল ফিতর

সাদকাতুল ফিতর মুসলিম নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, আজাদ-গোলাম সকলের উপর ওয়াজিব। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে আজাদ, গোলাম, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় সকল মুসলিমের উপর এক সা’ খেজুর, বা এক সা’ যব সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। পেটের বাচ্চার পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর দেয়া ওয়াজিব নয়, কিন্তু কেউ যদি আদায় করে, তাহলে নফল সদকা হিসেবে আদায় হবে। ওসমান রাদিআল্লাহু আনহু পেটের বাচ্চার পক্ষ থেকে সদকায়ে ফিতর আদায় করতেন। ফিতরা নিজের পক্ষ থেকে এবং নিজের পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে আদায় করবে। যেমন স্ত্রী ও সন্তান। যদি তাদের নিজস্ব সম্পদ থাকে তবে তাদের সম্পদ থেকেই সদকাতুল ফিতর আদায় করবে।

এক নজরে সদকাতুল ফিতর

ইবনে আব্বাস রা. একবার রমজানের শেষ দিকে বসরায় খুতবা প্রদান করেন। সেখানে তিনি বলেন, তোমাদের রোজার সদকা আদায় করো। লোকেরা যেন ব্যাপারটা বুঝতে পারে নি। তখন ইবনে আব্বাস রা. বললেন, এখানে মদীনার কে আছে দাঁড়াও। তোমাদের ভাইদেরকে বলো, তারা তো জানে না। বলো যে, রাসূল সা. এই সদকা আবশ্যক করেছেন। এক সা খেজুর বা যব অথবা আধা সা গম প্রত্যেক স্বাধীন-দাস, পুরুষ-নারী, ছোট-বড় সবার ওপর ওয়াজীব। (আবু দাউদ : ১৬২২)

যাকাত না দেওয়ার পরিণাম

যাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম। ঈমান ও ছালাতের পরেই যাকাতের স্থান। মহান আল্লাহ পৃথিবীর মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বৃদ্ধির জন্য যাকাত ফরয করেছেন। পবিত্র কুরআনে ৩২ জায়গায় যাকাত আদায় করার ব্যাপারে আলোচনা এসেছে। যাকাত না দিলে সম্পদ শুধু ধনীদের কাছে জমা হয়। ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয় এবং ধনীরা ও সূদখোররা জোঁকের মত সমাজের রক্ত শোষণ করে নিজে বড় হয়, আর সমাজকে রক্তহীন করে দেয়। তাই পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে যাকাত না দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যাকাত না দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কেই নিম্নোক্ত হাদীছ-