আমরা মনে করি, যাকাত চর্চা সম্প্রসারনের ক্ষেত্রে এর অসংখ্য তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক দিক নিয়ে ব্যাপক গবেষণার কোন বিকল্প নেই। এই গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র হচ্ছে যাকাত বিষয়ক প্রবন্ধ/নিবন্ধ রচনা। আমরা চাই বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় বিশেষ করে বাংলা ভাষায় যাকাতের উপর বহু সংখ্যক লেখক সৃষ্টি হোক এবং তাদের থেকে প্রচুর মান সম্পন্ন লেখা বেরিয়ে আসুক। এ বিষয়টিকে কার্যকর ভাবে উৎসাহিত করার জন্য আমরা এখানে যাকাত বিষয়ক বিভিন্ন রচনা উপস্থাপন করবো। এগুলো আমরা নিজেরা সংগ্রহ করবো। তাছাড়া কোন আগ্রহী লেখক তাঁর লেখা প্রবন্ধ/নিবন্ধ সরাসরি আমাদের কাছে পাঠাতে পারবেন। উভয় ক্ষেত্রেই উপস্থাপনের পূর্বে রচনার মানের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। তবে লেখার বক্তব্যের ব্যপারে লেখক নিজে দায়ী থাকবেন। সংগৃহীত কোন লেখা বিনা অনুমতিতে উপস্থাপনের ব্যপারে লেখকের আপত্তি থাকলে তা আমাদেরকে অবগত করার অনুরোধ রইল। আমরা সজ্ঞানে কোন অনুমতি সাপেক্ষ রচনা বিনা অনুমতিতে আমাদের এই সাইটে উপস্থাপন করবো না।
যাকাত আদায়ের মানবিক পথ খোঁজা
সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য তাদের সম্পদের ওপর ধার্য যাকাত প্রদান করা ধর্মীয় কর্তব্য। পবিত্র কোরআন শরীফে ৩০ বার যাকাত প্রদানের কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশে ধর্মের প্রতি অনুগত মুসলমান যাকাত আদায় করে থাকেন। বড় অঙ্কের যাকাত আদায়কারীদের কেউ কেউ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি এবং টাকা বিতরণ করতে পছন্দ করেন। আর তখন বোঝা যায় দেশে যাকাত গ্রহীতা দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কেমন। প্রায় বছরই এ ধরনের যাকাত বিতরণ করতে গিয়ে মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হতে হয় দরিদ্র আর নিম্ন আয়ের অনেক মানুষকে। যাকাত বিতরণের সময় অব্যবস্থাপনার কারণে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে মারা যান অনেক অসহায় মানুষ। একাধিকবার এমন অঘটন ঘটার পরও ঢাক-ঢোল পেটানো যাকাতদাতারা সতর্ক হন না। ফলে ভয়াবহ দুর্ভাগ্য মেনে নিতে হয়। এই ধারাবাহিকতার আপাতত শেষ ট্র্যাজেডি যাকাত নিতে এসে ময়মনসিংহে পদদলিত হয়ে ২৭ জনের মৃত্যু আর অনেকের আহত হওয়া।
আর্থিক ইবাদত যাকাত
মহান আল্লাহ্র সমীপে মানুষের সব সামর্থ্য সবিনয়ে সমর্পণ হলো ‘ইবাদত’। পবিত্র রমজানের অনুষঙ্গ ‘যাকাত’ একটি আর্থিক ইবাদত। অধিকাংশের মতে, হিজরি ৫ম সালে যাকাত ফরজ হয়। ইসলামের পঞ্চভিত্তির অন্যতম যাকাত, একটি সুদবিহীন ও শোষণ-দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের বাহন এবং ‘সামাজিক বীমা’। ০২.৫% যাকাত দানে ০৫% হারে দারিদ্র্যহ্রাস সম্ভব। পবিত্র কুরআনে নামাজের পর সর্বাধিক সংখ্যক আয়াতে ৩২ বার যাকাত শব্দ, ১২ বার পারিভাষিক অর্থে ও অসংখ্যবার অপারিভাষিক অর্থে উল্লেখিত। পবিত্র কুরআনে যাকাতকে ‘বঞ্চিত ও মুখাপেক্ষীর অধিকার’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করায় প্রিয়নবী (স) মু’য়াজকে (রা) দেয়া নির্দেশে বলেন, “এটা হচ্ছে ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করে দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা”।
যাকাত বিতরণ নিয়ে ইসলামের যা বিধান
পবিত্র মাহে রমযানের শেষ দিকে প্রতি বছরই একই মর্ম ঘটনার শোক আর ক্ষোভ মানুষকে ঘিরে নিচ্ছে। যাকাত নিতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন নিরণ্ন হত দরিদ্র মানুষ। গতকাল প্রভাতে ময়মনসিংহে যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে নারী ও শিশুসহ ২৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনা পুরো জাতিকে বেদনা-বিক্ষোভে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আলোচনার মূল বিষয়ই এখন এভাবে কি যাকাত প্রদান ইসলাম সম্মত। এই যাকাত প্রদান হলো ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। যাকাত হচ্ছে বিত্তবানদের ধন-সম্পদের সেই অপরিহার্য অংশ যা সম্পদ ও আত্মার পবিত্রতা বিধান, সম্পদের ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং সর্বোপরি আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত খাতে ব্যয় করা হয়। যাকাত হচ্ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার একটি অনুপম সমাধান। যাকাত দ্বীনের এমন রুকন যা অস্বীকার করা কুফরী। যাকাত হলো গরিবের হক। যা সম্পদশালীর কাছে আমানত। যাকাত প্রদানে একটি বিশেষত্ব এই যে, এটি গোপনে দেয়ার ব্যাপারে উত্সাহী করা হয়েছে।
মাহে রমজান যাকাত আদায়ের উপযুক্ত মৌসুম
ইসলামে রমজান মাসে সিয়াম সাধনাকে দেহের যাকাতস্বরূপ বলা হয়েছে। রমজান মাসে রোজা পালন করলে যেমন সারা শরীর পবিত্র হয়ে যায়, তেমনি মাহে রমজানে কড়ায়-গণ্ডায় যাকাত আদায় করলে মানুষের উপার্জিত সব সম্পদ পবিত্র হয় এবং অধিক সওয়াব হাসিল করা যায়। এই যাকাত দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রমজান মাসই যাকাত আদায়ের সর্বোত্তম সময়। সিয়াম পালন করে রোজাদারেরা পরস্পরের প্রতি সহমর্মী ও সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন। ফলে বিত্তবানেরা দান-সাদকা ও যাকাত-ফিতরা প্রদানে উত্সাহিত হন। রমজান মাসে যেকোনো ধরনের দান-সাদকা করলে অন্য সময়ের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি নেকি হাসিল হয়। যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একটি নফল ইবাদত করেন, তবে তিনি মাহে রমজানে একটি ফরজ ইবাদতের সমান সওয়াব পাবেন। যিনি একটি ফরজ আদায় করবেন, তিনি অন্যান্য মাসের ৭০টি ফরজের সমান সওয়াব পাবেন। তাই রমজান মাসে রোজাদার মুমিন বান্দারা একসঙ্গে গরিবে হক যাকাত ও ফিতরা আদায়—এ দুটি আর্থিক ইবাদত করে থাকেন। রমজান মাসে সমাজের ধনী লোকের যাকাত-ফিতরা বা দান-সাদকা প্রদান করুণার বিষয় নয়, এগুলো হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক।
সদকাতুল ফিতর
আ ল্লাহ রাব্বুল আলামীন রমজান সমাপনান্তে ঈদুল ফিতরের দিন ছাহেবে নেছাব অর্থাত্ ধনী ব্যক্তিদের প্রতি একটি নির্দিষ্ট সদকা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। এটিই সদকায়ে ফিতর নামে পরিচিত। রমজানের রোজার মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনরূপ ভুল ত্রুটি হলে, তা সংশোধনপূর্বক রোজাকে বিশুদ্ধ করার জন্যে সদকায়ে ফিতরের গুরুত্ব ও তাত্পর্য অপরিসীম। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, সদকায়ে ফিতর আদায় না করা পর্যন্ত বিত্তবান রোজাদারদের রোজা আসমানে লট্কানো অবস্থায় থাকে। তা আল্লাহর কবুলিয়াতের দরজায় পৌঁছাতে পারে না। সদকায়ে ফিতর আদায় করার সঙ্গে তা আল্লাহর দরবারে উপনিত হয়।
যাকাতের মাসায়িল
ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হল যাকাত। যাকাত হচ্ছে ধনীর সম্পদে গরিবের হক। ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূর করতে যাকাতের ভূমিকা অপরিসীম। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকাতের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন, “তোমরা নামাজ কায়েম কর ও যাকাত দাও। আর তোমরা নিজের জন্য যে ভালো কাজ আগেভাগে করবে তার সওয়াব ও পুরস্কার আল্লাহর কাছে পাবে।” (সূরা বাকারা, আয়াত ১১০)