সদকাতুল ফিতর

লেখক : মাওলানা শাহ্ আবদুস সাত্তার, সভাপতি, বালাদেশ সীরাত মিশন
উৎস : দৈনিক ইত্তেফাক
প্রকাশ : ০১ জুলাই, ২০১৬ ইং ০০:০০ মিঃ

 

সদকাতুল ফিতর

আ ল্লাহ রাব্বুল আলামীন রমজান সমাপনান্তে ঈদুল ফিতরের দিন ছাহেবে নেছাব অর্থাত্ ধনী ব্যক্তিদের প্রতি একটি নির্দিষ্ট সদকা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। এটিই সদকায়ে ফিতর নামে পরিচিত। রমজানের রোজার মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনরূপ ভুল ত্রুটি হলে, তা সংশোধনপূর্বক রোজাকে বিশুদ্ধ করার জন্যে সদকায়ে ফিতরের গুরুত্ব ও তাত্পর্য অপরিসীম। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, সদকায়ে ফিতর আদায় না করা পর্যন্ত বিত্তবান রোজাদারদের রোজা আসমানে লট্কানো অবস্থায় থাকে। তা আল্লাহর কবুলিয়াতের দরজায় পৌঁছাতে পারে না। সদকায়ে ফিতর আদায় করার সঙ্গে তা আল্লাহর দরবারে উপনিত হয়।

সদকায়ে ফিতরার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অনেক। হজরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, হজরত নবী করীম (স) সদকায়ে ফিতরাকে ফরজ করেছেন। যেহেতু সদকায়ে ফিতরা রোজাকে কু-বাক্য হতে পবিত্র করে এবং সদকায়ে ফিতর মিসকিনের আহার্য। হজরত ওমর (রা) হতে বর্ণিত আছে যে, আমাদের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ (স) সদকায়ে ফিতরাকে মুসলমান ক্রীতদাস, স্বাধীন ব্যক্তি, পুরুষ-স্ত্রী, ছোট-বড়, ধনী-মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে সকলের প্রতি ওয়াজিব করেছেন এবং ঈদের নামাজে রওয়ানা হবার আগেই তা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।

যে সকল সামর্থ্যবান ব্যক্তির হাতে সারা বছরের ভরণ-পোষণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচাদি বাদে নেছাব পরিমাণ মাল অর্থাত্ সাড়ে সাত ভরি সোনা বা ৫২ ভরি রৌপ্য অথবা নির্দিষ্ট সংখ্যক পশু থাকবে, তার ৪০ ভাগের একভাগ যাকাত দিতে হয়। পক্ষান্তরে সদকায়ে ফিতরের বেলায় সারা বছরের হিসাবের কোন শর্ত নেই। শুধু ঈদের দিনে ঐ পরিমাণ বস্তু সামগ্রী মওজুত থাকলে তাকেও ফিতরা আদায় করতে হবে। মোটকথা, ঈদুল ফিতরের দিন যার অবস্থা মোটামুটি সচ্ছল, তাদের প্রত্যেকের রোজার সদকায়ে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। সদকায়ে ফিতরা গৃহকর্তা, নাবালেগ সন্তান-সন্ততি এবং ঈদের দিন ফজর নামাজের পূর্বে যদি কোন সন্তান ভূমিষ্ট হয় তবে তার পক্ষ থেকেও আদায় করতে হবে। অবশ্য এ সময় যদি কেউ মারা যান তাবে তার পক্ষ থেকে ফেতরা দিতে হবে না। সন্তান বা স্ত্রী নিজেরাই যদি সাহেবে নেছাব হন, তবে তারা নিজেদের ফিতরা নিজেরাই আদায় করবেন। মূলত এটা মানবতার প্রতি হাত বাড়িয়ে দেয়ার শামিল।

সদকায়ে ফিতরা আদায়ের পরিমাণ সম্পর্কে অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। আরবী ওজনে এই পরিমাণকে অর্ধ্ব ছা’বলা হয়েছে। কারো কারো মতে, এই ওজনে ৮০ তোলার পৌনে দু’সের অথবা একসের চৌদ্দ ছটাক ধরা হয়। সন্দেহ স্থলে কম পরিমাণটি না দিয়ে বেশি পরিমাণে ফেতরা আদায় করা উত্তম। গম, গমের আটা অথবা যব দ্বারা ফিতরা আদায় করা উচিত। ধান, চাল ছাড়া ফিতরা দিতে হবে, এসব বস্তুসমূহের মূল্য দ্বারা ফিতরা দেওয়া জায়েজ। আমাদের দেশে খোলা বাজারের স্বাভাবিক মূল্য ও ধান-চাল-গম আটার একটি সরকারি মূল্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে খোলা বাজারের স্বাভাবিক দ্রব্য-মূল্য অনুযায়ী ফিতরা আদায় করা উচিত। উল্লেখ্য, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এ বছর সর্বনিম্ন ৬৫ এবং সর্বোচ্চ ১৬৫০ টাকা ফিতরা হিসেবে ধার্য করেছে। যারা নিজেরা ছাহেবে নেছাব নয় অর্থাত্ অভাবগ্রস্থজন তারাই সদকায়ে ফিতরা পাবার যোগ্য। অভাবগ্রস্থ ভাই-বোন এবং তাদের সন্তান- সন্ততি, নিকটবর্তী ও দূরবর্তী প্রতিবেশী, গরিব তালেবে এলেম ও গরিব আলেমগণকে ফিতরা দিলে ভাল হবে। অনূন্য একজনের ফিতরা একজনকে দেয়া জায়েজ। ভাগ করে দেওয়া উচিত নয়। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, রাস্তা-পুল, ঈদগাহ বোডিং অর্থাত্ জন সাধারণের প্রতিষ্ঠানে ফিতরা প্রদান করা জায়েজ নয়। এ ছাড়া বিধর্মী এবং সৈয়দ বংশীয় কোন লোককে ফিতরা দিলে তা আদায় হবে না। রোজার মধ্যেও ফিতরা আদায় করা যায়। তবে ঈদের দিন ফজরের নামাজ আদায়ের পরে ঈদের নামাজ আদায়ের পূর্বে ফিতরা আদায় করা উত্তম।