যাকাত সম্প্রসারণ কার্যক্রম

যাকাত : ধনীর সম্পদে গরীবদের স্বীকৃত অধিকার-ড. সৈয়দ রেজওয়ান আহমদ।

যাকাত একটি আর্থিক ইবাদত। যা ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের অন্যতম এবং ইসলামী অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তি। একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে যাকাতের ভুমিকা অনন্য।
মহান আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা নামায কায়েম কর ও যাকাত আদায় কর।” (আল কুরআন ; ২ : ৬০) যাকাত রাষ্ট্র পরিচালনায় গৃহীত করের মত নয়। এটা সমাজ তথা রাষ্ট্রের অভাবগ্রস্থদের অভাব মেটানোর জন্য প্রদত্ত ধনীদের সম্পদের একটি অংশ যা বছর শেষে দেয়া হয়। এটা ধনীদের সম্পদে গরীবদের স্বীকৃত অধিকার মাত্র। ইহা গরীবদের প্রতি ধনীদের অনুগ্রহ নয়।
যাকাতের মাধ্যমে মানুষ মানুষের অধিকার লাভ করে এবং সবার হৃদয় হয় পবিত্র।
যাকাত গ্রহণের কারণ :
অন্যতম কয়েকটি কারণ বর্ণনা করা হল:
ক) দারিদ্র দূরীকরণ: যাকাত দারিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকার জন্য ধনীদের উপর একটা বিধিবদ্ধ দেয়। এর মাধ্যমে অস্বচ্ছল সমাজকে স্বচ্ছল করে তোলা যায়। কারো কারো ধারণা বর্তমানে দেশের ব্যাংকসমূহে যে অর্থ জমা আছে তার উপর যাকাত ধার্য করা হলে আমাদের দেশের দারিদ্র দূরীকরণে যত অর্থের প্রয়োজন তার চেয়ে বেশী অর্থ আদায় হবে।
খ) শ্রেণী সংঘাতের অবসান:
মানুষ প্রকৃতিগতভাবে অসমান প্রকৃতির হলেও কেউ আকাশচুম্বী অট্টালিকায় থাকবে আর কেউ ন্যুনতম বসবাসের সুযোগও পাবেনা এটা ইসলাম সমর্থন করেনা। অনাথ, অচল, বৃদ্ধ, নি:স্ব, এতিম, অসহায়, বিধবা ইত্যাদি শ্রেণীর লোকদের মাঝে যদি সঠিকভাবে যাকাত বন্টন করা হয় তাহলে দেশের সকলের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটামুটি কাছাকাছি চলে আসত। চরম অসামঞ্জস্যের কারণে সৃষ্ট অসুবিধা আর থাকবেনা। ইসলাম কোন ব্যক্তি কর্তৃক অন্য কোন ব্যক্তিকে ঘৃনা করতে না শিখিযে একটা মুক্তচিন্তা সম্পন্ন জাতি উপহার দিতে চায়। তাই শ্রেণী সংঘাত মেটনো তার একান্ত চাহিদা যা যাকাতের মাধ্যমেই সম্ভব।
গ) সামগ্রিক কল্যাণ সাধন:
যাকাত মানুষের মাঝে সমন্বয় সাধনের অন্যতম হাতিয়ার। মহান আল্লাহ বলেছেন, “তাদের সম্পদ থেকে সাদকা (যাকাত) গ্রহণ করবে। এ দ্বারা তুমি তাদের আশির্বাদ করবে। তোমার আশির্বাদ তাদের জন্য চিত্ত-স্বস্তিকর। আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ। বস্তুত: যাকাত সর্বস্বরের লোকের জন্য কল্যাণকর।
ঘ) সামাজিক নিরাপত্তা বিধান:
দুনিয়ার প্রতিটি মানুষ মানুষের মত বাঁচতে চায়। একটা ব্যাপক। অগ্নিকান্ড লক্ষ লক্ষ জনতাকে ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত করতে পারে। একটা সাইক্লোন হাজারো মা বোন ভ্রাতাকে পথে বসাতে পারে। হঠাৎ পিতৃ-বিয়োগ কোন অসহায় এতিমকে হতাশায় নিপতিত করতে পারে। এমন হাজারো ঘটনা পৃথিবীতে ঘটছে ও ঘটতে থাকবে। এজন্য অবশ্যই একটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বোধের সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য ইসলাম যাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক অনন্য হাতিয়ার।
ঙ) রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা সৃষ্টি :
দারিদ্র মানুষকে কুফরীর দিকে নিয়ে যায় (হাদিস)। দরিদ্র ও বেকার জনগোষ্টী ুন্নিবৃত্তির জন্য বিবেকের কাছে হেরে সমাজে চুরি, ডাকতি, হাইজ্যাকিং সহ নানা অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। অর্থহীনতায় তার হন্যে হয়ে ঘুরে। সমাজ গঠনে এরাই বিরাট অবদান রাখতে পারে।
রাষ্ট্রীয় কল্যাণে যাকাত ঃ
যাকাত তহবিলে যথাযথ পরিচালনার যাকাত আদায়ের ও বিতরনের অধিকার প্রশ্নাতীতভাবেই মুসলিম রাষ্ট্রের উপর ন্যন্ত।যাকাত মূলত: অন্তরের কল্যাণ কামনার বহি:প্রকাশ যা একজন সম্পদের ভালবাসা ও কৃপণতাকে ত্যাগের মাধ্যমে অর্জন করে। যারা সমাজে নিগৃহীত-বঞ্চিত তাদেরকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করা এবং সমাজে তাদেরকে সম মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যবস্থা করাই রাষ্ট্রের আসল কল্যাণ। মৌলিক চাহিদা পুরণ করা একটা রাষ্ট্রের জন্য মূল কর্তব্য। তাই ইসলাম ৮টি খাতে যাকাত ব্যায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কল্যাণে সাধনের এক সুন্দর নির্দেশনা পেশ করেছে।
নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে তা বর্ণনা করা হল:
১। ফকির (ফুকারা)ঃ ইমাম আবু হানিফার (র:) মতে ফকির শব্দ দ্বারা সেই ব্যক্তিকে বুঝায়, যার প্রয়োজনীয় বস্তুর অভাব রয়েছে অর্থাৎ যে টানটানি অবস্থায় রয়েছে। এতে সব ধরনের গরীব অন্তর্ভূক্ত, সে দারিদ্র স্থায়ী বা অস্থায়ী বা যে কোন ধরনের হতে পারে। এতিম, অসহায়, বিধবা, বেকার, হঠাৎ বিপদগ্রস্থ ব্যক্তি ইত্যাদি এর অন্তর্গত।
২। মিসকিন (মাসাকিন) ঃ যদিও কিছু কিছু পন্ডিত ফকির ও মিসকিন শব্দ দুইটির ভিন্ন অর্থ প্রদান করেছে, তবুও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও কুরআনে এর ব্যবহার অনুসারে ইমাম আবু হানিফা (র:) এর ব্যাখ্যাই সঠিক বলে মনে হয়। তাঁর মতে মিসকিন শব্দ দ্বারা বুঝায়, যার কিছুই নেই অর্থাৎ যে সহায় সম্বলহীন। মিসকিন মূলত: ফকিরের চেয়ে নিম্নমানের। তবে প্রকৃত মিসকিন তারা যারা নিঃস্ব অথচ কারো পা ধরে যঞ্চা করেন না (আল-হাদীস)।
৩। যাকাত কর্মচারী (আমিলীন) ঃ সুরা তাওবার ১০৩নং আয়াতের আলোকে ঝুঝা যায়, যাকাত সংগ্রহ ও বন্টন ইসলামী সরকারের একটা অপরিহার্য দায়িত্ব। এজন্য যারা এ কাজে নিয়োজিত তাদের পারিশ্রমিক যাকাত তহবিল থেকে প্রদান করা বৈধ হবে। এদের মধ্যে রয়েছে- (ক) যাকাত আদায়কারী (খ) যাকাত বিতরণকারী, (গ) যাকাত সংণকারী, (ঘ) যাকাতের পণ্য ওজনকার, (ঙ) কেরানী, (চ) হিসাব রক, (ছ) তথ্য সংগ্রাহক, (জ) যাকাতের অর্থ গ্রহিতাদের জমায়েতকারী, এবং (ঝ) যাকাত অধিকর্তাগণ (যাকাত কেন্দ্রের পরিচালক)। উল্লেখ্য যে, রাষ্ট্রের বেতনভুক্ত অন্যান্য কর্মকর্তারা এ তহবিল থেকে অর্থ গ্রহন করতে পাবেনা। তবে ইমাম আবু হানিফার (র:) মতে যথাযথ স্বচ্ছল ব্যক্তির টটো নেয়া উচিৎ নয়। কিন্তু ঈমাম শাফে’ই ও মালিকী মযহাবে কোন আপত্তি নেই। গুটি কয়েক আইন ব্যাখ্যা ছাড়া সাধারণভাবে স্বীকৃতি যে, যাকাত কর্মচারীদের প্রদত্ত বেতন মোট যাকাতের অর্ধেকের বেশী হবেন। অন্যান্যরা তিন চতুর্থাশং বলে মত প্রকশ করেন। তবে আমার মনে হয় যাকাত কর্মচারীরা যদি স্বচ্ছল হন তাহলে তাদের অবৈতনিকভাবে কাজ করা উচিত। ফলে যাকাতের মূল উদ্দেশ্য অর্জন সহজতর হবে। হাদিসের ভাষায় এদের মুজাহিদ সম্বোধনটাও যুক্তিসংগত হবে।
৪। যাদের হৃদয় ইসলামের প্রতি আগ্রহ (মুয়াল্লাফাতুল কুলুব) :-
যাদেরকে ইসলাম আর্থিক সাহায্য দানের মাধ্যমে ইসলামের দিকে ফিরিয়ে আনতে চায় তাদেরকে “ মুয়াল্লাফাতুল কুলুব” বলে। মূলত: নওমুসলিমরা এর অন্তর্ভূক্ত।
নিম্নোক্ত ব্যক্তিদেরকে তাদের সমর্থন, ইসলামের জন্য সহযোগিতা, অনুগত্য লাভ বা কমপক্ষে তাদের বৈরীতা থেকে নিস্কৃতি লাভের জন্য স্থায়ী বা অস্থায়ী সাহায্য দেয়া যেতে পারে।
ক) ইসলামের ঐসব সক্রিয় শত্রু যারা অর্থ পেলে শান্ত থাকবে।
খ) ঐসব নাস্তিক যারা আর্থিক সাহায্য বা উপঢৌকন পেরে মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করবে।
গ) যে ইসলামে দীতি হয়েছে কিন্তু তার মানসিকতা এত দূর্বল যে, আর্থিক সাহায্য না পেলে সে নাস্তিকতায় ফিরে যেতে পারে এবং তার শত্রুতা ইসলামের বিরাট তির কারণ হয়ে দাড়াবে।
৫। ক্রীতদাস ও বন্দী মুক্তি (ফির-রিকাব) ঃ ইসামী আদর্শের মূল কথা হল সৃস্টি শুধু স্র্ষ্টারই দাসত্ব করবে, কোন সৃষ্টি শক্তির নয়। মানব কল্যাণে যাকাতের অর্থ প্রদানের এ খাত সে দিক নির্দেশনাই প্রদান করছে। যাকাতের অর্থ দাসমুক্তি ও বন্দী মুক্তিতে ব্যবহার করা যাবে। এটা দুভাবে হতে পাবে।
ক) যদি কোন দাস (মুকাতাব) তার মুনিবের সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকে যে, তাকে নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ দিলে সে তাকে মুক্ত করে দেবে, তাহলে সেেেত্র যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।
খ) সাধারণভাবে দাস ক্রয় করে মুক্ত করার কাজে এ অর্থ ব্যয় করা যাবে। ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ী, আলী, সাঈদ বিন শিরিন (র:) প্রমুখ এ েেত্র অর্থের মালিকানা দাসদের কাছে হস্তান্তরিত হয়না। তবে ইবনে আব্বাস, হাসান বসরী, মালেক, আহমাদ এবং আবু ছাওর (রা:) একে বৈধ বলেছেন।
মুলত: রিকাব শব্দটি দ্বারা ঐ সব মুসলিমকে বুঝায় যারা শত্রুর হাতে বন্দি হয়েছে। আর বাস্তুবে ঋণের েেত্র অর্থটা উত্তমর্ণের কাছেই যায় এবং এেেত্র ঋণমুক্তির সুবিধা লাভ করে ঋণী ব্যক্তি। যেহেতু ঋণ মুক্ততে যাকাত ব্যয় করা বৈধ, সুতরাং দাস ক্রয় করে বা বন্দী মুক্তির েেত্রও এটা বৈধ। এখনে অথৃ মুনিব পেলেও মুক্ত হওয়ার সুবিধা দাসই ভোগ করে।
৬। ঋণগ্রস্থ (গারিমীন) ঃ কোন লোক যদি এমন ঋণগ্রস্ত হয় যে, তার ঋণ পরিশোধ করতে তার নেসাবের নীচে নেমে যাবে তাহলে ঐ ঋণ পেিশাধ করার জন্য যাকাতে অর্থ দেয়া যাবে। এত্রে চাকুরীবীবি, বেকার, ধনী, নি:স্ব ইত্যাদি বিচার্য নয়। তবে স্বাভাবিকভাবে এজন্য তিনটি শর্ত আরোপ করা হয়ে থাকে।
ক) গৃহীত ঋণ কোন সংগত কারণে করা হয়েছিল এমন হতে হবে। বেআইনী যথা- জুয়া, মদ খাওয়া, অপব্যয় ইত্যাদি কাজের জন্য গৃহীত ঋণ যাকাতের অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা যাবেনা, যদিও হানাফী মাযহাবে ভিন্নমত পোষন করা হয়েছে। অন্যদিকে নিশ্চয়তা দানের েেত্র আপন কাধে ঋণের বোঝা এলেও সামর্থ না থাকলে যাকাত তহবিলের অর্থ গ্রহণ করা যাবে।
খ) ঋণ অবশ্যই কোন মুসলমান ব্যক্তির থেকে গৃহীত হতে হবে। তবে এ েেত্রও ভিন্ন মত রয়েছে। মালেকী মাযহাবে ঋণ পরিশোধ না করলে জেল হওয়ার আশংকা থাকইে কেবল যাকাতের অর্থ দেযা যাবে। তবে এটা কুরআনের ধারনার সাথে অসামঞ্জস্য বলে মনে হয়।
গ) যাকাত তহবিল থেকে সাহায্য গ্রহনের পূর্ব ঋণগ্রহিতা অবশ্যই আইনসংগতভাবে নিজ উদ্যোগে ঋণ পরিশোধের সাধ্যমত চেষ্টা করবেন। তবে প্রত্যেক মুসলিম উত্তর্ণ ঋণ মাফ করে দিলে সার্বাধিক কল্যাণ লাভ করবে।
৭। আল্লাহর রাস্তায় (ফি সাবিলিল্লাহ) ঃ আল্লাহর পথে অর্থ হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। এজন্য কেউ কেউ বলেন, যাকাতের অর্থ সব সৎকাজে ব্যয় করা যাবে। কিন্তু প্রকৃত পে এবং অধিকাংশ মনিষীর মতে, ফি সাবিলিল্লহ অর্থ জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। অর্থাৎ অনৈসলামিক পন্থাকে উচ্ছদ করে ইসলামী জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য এ অর্থ ব্যয় করা যাবে। মূলত: ফি সাবিলিল্লাহ যুদ্ধের চেয়েও ব্যাপক অর্থবহ। দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রাথমি স্তর থেকে শুরু করে চুড়ান্ত স্তর পর্যন্ত সব কাজই এর অন্তর্ভূক্ত।
৮। মুসাফির (ইবনে সাবিল) : যদি কোন পরিব্রাজক অর্থ সংকটে নিপতিত হন তখন যাকাতের অর্থ থেকে তাকে সাহায্য করা যাবে। যদিও তিনি অর্থশালী হোন না কেন। কেউ কেউ একে বৈধ কাজের সফরের সাথে সম্পৃক্ত করে থাকেন। কিন্তু কুরআন হাদিসে এমন কোন শর্তরোপ করা হয়নি। তবে আইন ব্যাখ্যায় তারা এেেত্র দুটি শর্তরোপ করেছেন। যথা:
(ক) পর্যটকদের সফর সম্পূর্ণ আইনসংগত প্রয়োজনে হতে হবে এবং (খ) যাকাত তহবিল থেকে সাহায্য গ্রহনের আগে ভ্রমনকারী ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের অসুবিধা দূর করার চেষ্টা করবেন।
মূলত: এখন চিন্তা করা দরকার, এ ৮টি খাতে যাকাতের অর্থ কিভাবে ব্যয় করলে সমাজ সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ হবে, রাষ্ট্র হবে সমৃদ্ধশালী এবং সর্বশ্রেণীর লোক এর কল্যাণ লাভে হবে ধন্য। আর এর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সৎ, যোগ্য, খোদাভীরু সরকার ও দ্বীনদার প্রশাসন।
যাকাত আদায়ের খাত ও নেছাব:
বিভিন্ন খাত থেকে যাকাত কত পরিমাণ আদায় করতে হবে তার একটি সংক্ষিপ্ত ছক নিম্নে উদ্ধৃত হল।
নং বিষয় নেছাব (সর্বনিম্ন পরিমাণ) যাকাতের হার
১। নগদ অর্থ, ব্যাংকে জমা এবং ব্যবসায়িক পন্য ৫২.৫ তোলা রুপার মূল্যমান সম্পূর্ণ মূল্যের ২.৫%
২। স্বর্ণ, রৌপ্য বা সোনা- রুপার অলংকার সোনা ৭.৫ তোলা এবং রুপা ৫২.৫ তোলা ঐ
৩। কৃষিজাত দ্রব্য (আবু হানিফা- যে কোন পরিমাণ, অন্যান্য-৫ ওয়াছাক বা ২৬ মন ১০ সের, ইস: ইকো: রিসা: ব্যুরো ১৫৬৮কেজি)
ক) বৃষ্টিতে উৎপাদিত দ্রব্যের ১০%
খ) সেচকৃত দ্রব্যের ৫%
৪। খনিজ দ্রব্য যে কোন পরিমাণ দ্রব্যের ২০%
৫। ভেড়া ছাগল- ৪০ টা হলে তার উপর যাকাত আসবে ইহা সর্বনি¤œ ১টি ভেড়া বা ছাগল। এবং ৫০০ এর অধিক হলে। ৫টি বা প্রতি শতে ১টি
৬। গরু -মহিষ- ৩০টা হলে তার উপর যাকাত আসবে ইহা সর্বনি¤œ ১টি ১ বছরের বাছুর। এবং ৬০ এর অধিক হলে।  ১টি ৩ বছরের বাছুর ও ১টি ২ বছরের বাছুর।
৭। উট ৫ টা হলে তার উপর যাকাত আসবে ইহা সর্বনি¤œ ১টি ৩বছরের খাসি বা ১টি ১বছরের বকরি এবং ১৫০ থেকে উপরে হলে ৩টি ৪বছরের উট ও প্রতি ৫টিতে ১টি ছাগল।
৮। ঘোড়া তিনটি মত যাকাত নেই। বা সম্পূর্ণ মুল্যের ২.৫% বা প্রতিটি ঘোড়ার জন ১দিনার।
৯। মধু – যাকাত নেই
১০। শেয়ার ব্যাংক নোট, ষ্টক ইত্যাদি  ৫২.৫ তোলা রুপার মূল্যমান সম্পূর্ন মুল্যের ২.৫% তবে কোম্পানী যাকাত দিলে ব্যক্তিগত যাকাত দিতে হবে না।
১১। অংশীদারী আরবার ও মুযারাবা ৫২.৫ তোলা রুপার মূল্যমান প্রথমে সম্পত্তির যাকাত দিতে হবে মূলধনের নয়। এরপর লাভ বন্টিত হবে। যাকাত ব্যক্তিগতভাবে লাভের উপর হবে, একভাগ দেবে মূলধন সরবরাহকারী (২.৫%) এবং একভাগ দেবে শ্রমদানকারী।
যাকাত সংগ্রহের নীতি:
নিম্নোক্ত ভাবে যাকাত সংগ্রহ করতে হবে;
১। প্রত্যেক বছরের রমজানের শেষ দিনের আগে যাকাত দিতে হবে। এ েেত্র যাবতীয সম্পদের বর্ণনাসহ একটি বিবরণী আগেই দাখিল করতে হবে।
২। বিবরণী দাখিলের সময় প্রদেয় যাকাত নির্ধারণ করে দেবে।
৩। যাকাত নির্ধারণে অর্থ ব্যয়িত হলে সে অর্থ কম প্রদান করবে।
৪। ফসলের েেত্র ফসল উঠার ১মাসের মধ্যে যাকাত প্রদান করতে হবে।
৫। নিম্নোক্ত বিষয়ে যাকাত দিতে হবে না:
ক) দোকানের স্থায়ী জিনিষের উপর যাকাত নাই কিন্তু বিক্রয়যোগ্য মালের উপর যাকাত আসবে
খ) জমি,কিন্তু জমি থেকে উৎপাদিত জিনিষের উপর যাকাত আছে গ) মিল, কারখানা, গুদাম ইত্যাদি,
ঘ) বাড়ী
ঙ) এক বছরের চেয়ে ছোট পশু
চ) জামা কাপড়,
ছ) কাগজ, বই ও ছাপান অন্যান্য ব্যবহার্য নিনিস,
জ) আসবাব পত্র,
ঝ) গৃহপালিত পাখী,
ঞ) ব্যবহার্য যন্ত্রপাতি, খুচরা যন্ত্রাংশ ও হাতিয়ার (মেরামতে)
ট) অস্ত্র সস্ত্র,
ঠ) যুদ্ধে ব্যবহৃত পশু,
ড) পচনশীল, কৃষিজাত দ্রব্য,
ঢ) বীজ,
ণ) বছরের মাঝে অর্জিত ও সাথে সাথে বয়িত সম্পদ,
ত) কোন সংগঠেনে দান করা সম্পদ,
থ) সরকারের অর্থ,
দ) কৃষি কাজ করে এমন পশু,
ধ) ব্যবসার জন্য নয় এমন পুকুরের মাছ,
ন) দুধ, বহন ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত পশু,
প) কার, সাইকেল ইত্যাদি যা চড়ার জন্য ব্যবহৃত হয,
ফ) পোল্ট্রি ফার্মের হাঁস মুরগী,
ব) ট্যাক্সি, বাস ইত্যাদি যা পরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এর মুনাফার উপর যাকাত ধার্য হবে,
ভ) গাধা, ঘোড়া খচ্চর যা ব্যবসায়িক পশু নয়।
আমার এই আলোচনা শুধু একটি পরামর্শ মাত্র। আমরা যাকাত বিষয়ে বিভিন্ন সেমিনারের মাধ্যমে দেশের বিজ্ঞজনদের সমন্বয়ে যাকাত সম্প্রসারণ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চেষ্টা করছি। তাছাড়া যাকাত বিষয়ে কিছু হিসাবকারীদের প্রশিক্ষনের মাধ্যমে আপনাদের সামনে প্রেরণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস আপনারা তাদের সহযোগিতার মাধ্যমে আপনাদের যাকাত হিসাব করে দিবার জন্য এগিয়ে আসবেন। এই আমাদের কামনা।
লেখকঃ অধ্যক্ষ
সৈয়দপুর সৈয়দিয়া শামছিয়া ফাজিল মাদরাসা
জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলো ব্যবহার করতে পারেন।

Share on facebook
ফেইসবুক
Share on twitter
টুইটার
Share on email
ইমেইল

স্বর্ণ এবং রৌপ্যের
বর্তমান বাজার মূল্য

আইটেমের নাম টাকা/ভরি টাকা/গ্রাম
স্বর্ণ ২২ ক্যারেট ৭৩,৪৮৬ ৬৩০০
স্বর্ণ ২১ ক্যারেট ৭০,৩৩৬ ৬০৩০
স্বর্ণ ১৮ ক্যারেট ৬১,৫৮৮ ৫২৮০
রৌপ্য ২১ ক্যারেট ১,৪৩৫ ১২৩
উৎস / সূত্র: বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি

অনুসন্ধান