যাকাত ও সাদাকাতুল ফিতর-ড. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন।

ইসলামী শরীআতের তৃতীয় মৌলিক স্তম্ভ হলো যাকাত। যাকাতের শাব্দিক অর্থ পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়া, পরিশুদ্ধ হওয়া, পরিচ্ছন্নতা লাভ করা ইত্যাদি। শরীআতের পরিভাষায় নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের নিকট এক বছর পর্যন্ত সে সম্পদ গচ্ছিত থাকলে জীবনযাত্রার অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণের পর স্থাবর সম্পত্তি ব্যতীত অবশিষ্ট সমুদয় সম্পদ হিসাব করে বছরের নির্দিষ্ট কোন এক সময় ২.৫% হারে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে শরীআহ নির্দিষ্ট খাতে বণ্টন করার নাম যাকাত। ইমাম তাইমিয়ার মতে, যাকাত প্রদানের মাধ্যমে যাকাত আদায়কারীর মন ও আত্মা পবিত্র হয়, বৃদ্ধি পায় তার ধন-সম্পদ। এ ক্রমবৃদ্ধি ও পবিত্রতা কেবল ধন সম্পদের মধ্যেই সীমিত থাকে না; বরং তা যাকাত প্রদানকারীর মন-মানসিকতা ও ধ্যান-ধারণা পর্যন্ত প্রসারিত হয়। এ প্রসঙ্গে সূরাহ আত-তাওবার ১০৩ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তুমি তাদের সম্পদ থেকে সাদাকাহ তথা যাকাত গ্রহণ কর যাতে তুমি এর দ্বারা সেগুলোকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করতে পার।’

যাকাতের গুরুত্ব : যাকাত এমন একটি ইবাদত যেটি প্রত্যেক নবী-রাসূলের শরীআতেই ফরয ছিল। ইসলামী শরীআতে ২য় হিজরীর শাওয়াল মাসে যাকাত ফরয করা হয়। কুরআনুল কারীমে সালাতের পরই সর্বোচ্চ সংখ্যক তথা ৫৮ বার যাকাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া যাকাতের সমার্থবোধক শব্দ সাদাকাহ তথা দান ব্যবহার করা হয়েছে ১৪ বার এবং ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ তথা আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ৭৩ বার। বাংলা ভাষায় রচিত চটি বইগুলোতে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের পঞ্চম স্তম্ভ হিসেবে যাকাতকে দেখানো হলেও মূলত: গুরুত্বের বিবেচনায় এটি ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। কুরআনুল কারীমে সূরাহ মু’মিনূন এর শুরুতে সফলকাম মু’মিন বান্দার ৭টি গুনাবলী উল্লেখ করা হয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম একটি গুন হলো ‘যাকাতের কর্মপন্থায় তৎপর থাকা।’ রাসূলে আকরাম (সা.) মু‘আয ইবন জাবালকে কুফার গভর্ণর করে পাঠানোর সময় নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, তাদের ধন-মালে আল্লাহ তা‘আলা সাদাকাহ তথা যাকাত ফরয করে দিয়েছেন, যা তাদের ধনীদের নিকট হতে গ্রহণ করা হবে এবং গরীবদের মাঝে বণ্টন করা হবে।’ ধন-সম্পদের মোহে পড়ার কারণে যারা বাহনা তালাশ করে এবং  যাকাত দেয়া হতে বিরত থাকে তাদের প্রতি কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করে সূরাহ আলে-‘ইমরানের ১০০ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা তাদের প্রতি অনুগ্রহ করে যে সম্পদ দান করেছেন যারা তাতে কৃপনতা করে তারা যেন ধারণা না করে যে এটি তাদের জন্য কল্যাণকর হবে; বরং এটি তাদের জন্য হবে ক্ষতিকর। যাতে তারা কৃপনতা করে, সে সমস্ত ধন-সম্পদকে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ী বানিয়ে পরানো হবে।’ যাকাত যারা পরিশোধ করে না তাদের পরকালীন শাস্তির বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা সূরাহ আত-তওবার ৩৪-৩৫ নং আয়াতে বলেন, ‘যারা স্বর্ণ, রৌপ্য সঞ্চিত করে রাখে অথচ তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন। সে দিন সে সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তাদের ললাটে, পৃষ্ঠে ও পাজরে দাগ দেয়া হবে এবং বলা হবে তোমরা তোমাদের সঞ্চিত সম্পদের স্বাদ আস্বাদন কর।’ সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত হাদীস হতে জানা যায়, যে সম্পদের যাকাত দেয়া হয় না সে সম্পদ কিয়ামতের দিন বিষধর অজগর সাপের রূপ ধারণ করবে আর তাকে দংশন করতে থাকবে। সুনানুন নাসাঈতে বর্ণিত একটি  হাদীস হতে জানা যায়, যাকাত না দেয়া উট ও গরু অধিক মোটা-তাজা হয়ে মালিকের কাছে এসে পায়ের ক্ষুর দিয়ে তাকে পিষ্ট করবে এবং শিং দিয়ে গুতো মারবে। ইসলামের অন্যান্য ফরয বিধান মানার পাশাপাশি কেউ যাকাত দিতে অস্বীকার করলে কিংবা শৈথিল্যতা প্রদর্শন করলে একটি ফরয বিধান লংঘনের দায়ে প্রকৃত মুসলমান হতে সে খারিজ হয়ে যাবে। সহীহ মুসলিম ও সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদীস হতে জানা যায়, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত আবু বকর (রা.) যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই সে সব লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, যারা নামায ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করবে। কেননা যাকাত হলো সম্পদের হক। আল্লাহর শপথ তারা যদি যাকাত ফরয হওয়া উট দিয়ে তার লাগাম দিতে অস্বীকার করে যা তারা রাসূলের (সা.) নিকট উপস্থিত করতো, আমি এ অস্বীকৃতির কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।’ তিনি যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে তাদের ইসলামের এ মৌলিক ফরয বিধান মানতে বাধ্য করেছেন।
যাকাতের নিসাবঃ যাকাতের নিসাব ইসলামী শরী‘আহ নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাহলো, স্বর্ণ বা স্বর্ণের তৈরী অলংকার হলে ৭.৫
তোলা,  রৌপ্য বা রৌপ্যের তৈরী অলংকার হলে ৫২.৫ তোলা, ব্যাংক ও হাতে মজুদ অর্থ কিংবা
ব্যবসায়িক পণ্য হলে ৭.৫ তোলা স্বর্ণ বা  ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের মূল্যের সমপরিমাণ, জমির উৎপাদিত ফসল হলে ৫ ওয়াসাক বা ২৬ মন, পুকুরে উৎপাদিত মাছ হলে ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে ৭.৫ তোলা স্বর্ণ বা  ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের মূল্যের সমপরিমাণ, উট হলে ৫টি, গরু-মহিষ হলে ৩০টি, ছাগল-ভেড়া হলে ৪০টি ইত্যাদি। উট, গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া ও ‘উশর ছাড়া অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে ২.৫% হারে যাকাত প্রদান করা আবশ্যক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৭.৫ তোলা স্বর্ণের চেয়ে ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের মূল্যের পরিমাণ অনেক কম হওয়ায় হাতে ও ব্যাংকে মজুদ অর্থ কিংবা ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের বাজার মূল্যের সমান সম্পদ থাকলে তার উপর যাকাত ফরয। যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির জন্য অধিক নিরাপদ হলো ব্যাংক কিংবা পোষ্ট অফিসে সংরক্ষিত সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, ডিপিএস এর জমা, যে কোন ধরনের ইন্স্যুরেন্সের জমা, নগদ সঞ্চয়, কোন ব্যক্তিকে দেয়া কর্জ – যা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের দ্বারা নির্মিত গহনার মূল্য ইত্যাদি যোগ করে কোন ঋণ থাকলে তা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পদ হিসাব করা।
আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারনা চালু আছে তা হলো, রৌপ্য ও রৌপ্যের ক্ষেত্রে নিসাব পূর্ণ না হলে যাকাত দিতে হবে না। সঠিক ও অধিক নিরাপদ মাসআলা হলো, অন্যান্য গচ্ছিত সম্পদের সাথে স্বর্ণ ও রৌপ্যের মূল্য হিসাব করে ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের বাজার মূল্যের সমান থাকলে যাকাত দিতে হবে। সুনানু আবী দাউদে বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়, জনৈক মহিলা সাহাবী তার কন্যাসহ রাসূল (সা.) এর নিকট উপস্থিত হলেন। এ সময়  মেয়েটির হাতে দুই গাছি স্বর্ণের কাঁকন ছিল। রাসূল (সা.) মহিলাটিকে প্রশ্ন করে যখন জানতে পারলেন স্বর্ণের কাঁননের যাকাত দেয়া হয় না, তখন জবাবে রাসূল (সা.) মহিলাটিকে বললেন, ‘তুমি কি খুশী হতে পারবে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা এর পরিবর্তে তোমার হাতে এক জোড়া আগুনের কাঁকন পরিয়ে দিবেন?’ অপর একটি ভুল ধারনা ব্যাপকভাবে চালু আছে তা হলো, ‘শুধুমাত্র যে সম্পদ এক বছর পর্যন্ত জমা থাকবে তার উপর যাকাত দিতে হবে।’ প্রকৃত কথা হলো নিসাব পরিমান সম্পদ কারো নিকট এক বছর থাকলেই হবে। সমুদয় সম্পদ এক বছর পর্যন্ত থাকা আবশ্যক নয়। তাই যাকাত দাতা যেদিন সম্পদের হিসাব করবেন তার দু’মাস কিংবা এক মাস পূর্বেও কোন সম্পদ তার নিকট হস্তগত হলে সেটিরও হিসাব করে যাকাত দিতে হবে।
যাকাত বণ্টনের খাতঃ যাকাত বণ্টনের খাত আল্লাহ তা‘আলা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সূরাহ আত-তওবার ৬০ নং আয়াতে যাকাত বণ্টনের আটটি খাত উল্লেখ করা হয়েছে। যথাঃ ফকীর, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী, যাদের চিত্ত আকর্শন করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরের জন্য। তন্মধ্যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চারটি খাত উল্লেখযোগ্য। যথাঃ ফকীর, মিসকীন, ঋণগ্রস্ত ও আল্লাহর পথে। করোনা নামক মহামারীর কারণে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত এমন বহু পরিবার রয়েছে তারাসহ যারা চক্ষু লজ্জার কারণে হাত পাততে পারে না, সে সকল পরিবার মিসকীনের খাতে পরে। এ সকল পরিবারে সহযোগিতা করার সময় এটি যে যাকাতের অর্থ তা বলা জরুরী নয়। অভাবের কারণে যারা দ্বারে দ্বারে সাহায্যের জন্য হাত পাতে তারা ফকীর। আল্লাহর পক্ষ হতে রাসূল (সা.) এর মাধ্যমে প্রেরিত জীবন ব্যবস্থা সমাজ ও রাষ্ট্রে কায়েমের যে আন্দোলন ও সংগ্রাম সেটি হলো ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ বা আল্লাহর পথ। আর যে ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের মত কোন সংগতি নেই সে হলো ঋণগ্রস্ত। যাকাত বণ্টনের সময় আমাদের এ খাতগুলোর প্রতি খেয়াল লাখা আবশ্যক।
সাদাকাতুল ফিতরঃ ‘ঈদুল ফিতরের দিন সকালে  কোন ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে পরিবারের পক্ষ হতে সকল সদস্যের জন্য সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। রোযার ত্রুটি বিচ্যুতির কাফফারাহ হিসেবে সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করা হয়েছে। অসংখ্য হাদীস হতে প্রমাণিত যে, পাঁচটি খাদ্য দ্রব্য যথা যব, খেজুর, পনির, কিশমিশ ও গম দ্বারা  সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে। তন্মধ্যে যব, খেজুর, পনির ও কিশমিশ এর ক্ষেত্রে এক সা‘ পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। আর গমের ক্ষেত্রে অর্ধ সা‘ পরিমাণ হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। এক সা‘ সমান ৩ কেজি ২৫৬ গ্রাম, আর দেশীয় ওজনে ৩ সের ১১ ছটাক। ইবন মাজাহতে বর্ণিত একটি হাদীস হতে জানা যায়, শ্যাম দেশের উত্তম গমের ক্ষেত্রে অর্ধ সা‘কে এক সা‘র সমপরিমাণ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য আমীরে মুয়াবিয়া প্রস্তাবনা দিলে তা সকলে গ্রহণ করেন। সে সময় হতে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার ক্ষেত্রে কেউ এক সা‘ আবার কেউ অর্ধ সা‘ প্রদান করে থাকেন। এক সা‘র মতামত অধিক শক্তিশালী হওয়ায় সেটিই আমাদের অনুসরণ করা অধিকতর কল্যাণকর। বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য চাল হওয়ায় যে ব্যক্তি যে মানের চাল খেয়ে থাকি, সে মানের চাল বা তার মূল্যও সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে আদায় করা যেতে পারে।

লেখকঃ ড. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন।

উৎসঃ দৈনিক সংগ্রাম।

প্রকাশের সময়ঃ বুধবার ২০ মে ২০২০ ।