মাহে রমজান যাকাত আদায়ের উপযুক্ত মৌসুম

লেখক : অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান,  চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ ও দাওয়াহ বিভাগ, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমণ্ডি, ঢাকা। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহাম্মদ (স)। উপদেষ্টা সম্পাদক, আমার ক্যাম্পাস।
উৎস : দৈনিক ইত্তেফাক
প্রকাশ : ১৭ জুন, ২০১৬ ইং ০০:০০ মিঃ

 

মাহে রমজান যাকাত আদায়ের উপযুক্ত মৌসুম

 ইসলামে রমজান মাসে সিয়াম সাধনাকে দেহের যাকাতস্বরূপ বলা হয়েছে। রমজান মাসে রোজা পালন করলে যেমন সারা শরীর পবিত্র হয়ে যায়, তেমনি মাহে রমজানে কড়ায়-গণ্ডায় যাকাত আদায় করলে মানুষের উপার্জিত সব সম্পদ পবিত্র হয় এবং অধিক সওয়াব হাসিল করা যায়। এই যাকাত দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রমজান মাসই যাকাত আদায়ের সর্বোত্তম সময়। সিয়াম পালন করে রোজাদারেরা পরস্পরের প্রতি সহমর্মী ও সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েন। ফলে বিত্তবানেরা দান-সাদকা ও যাকাত-ফিতরা প্রদানে উত্সাহিত হন। রমজান মাসে যেকোনো ধরনের দান-সাদকা করলে অন্য সময়ের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি নেকি হাসিল হয়। যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একটি নফল ইবাদত করেন, তবে তিনি মাহে রমজানে একটি ফরজ ইবাদতের সমান সওয়াব পাবেন। যিনি একটি ফরজ আদায় করবেন, তিনি অন্যান্য মাসের ৭০টি ফরজের সমান সওয়াব পাবেন। তাই রমজান মাসে রোজাদার মুমিন বান্দারা একসঙ্গে গরিবে হক যাকাত ও ফিতরা আদায়—এ দুটি আর্থিক ইবাদত করে থাকেন। রমজান মাসে সমাজের ধনী লোকের যাকাত-ফিতরা বা দান-সাদকা প্রদান করুণার বিষয় নয়, এগুলো হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক।

সারা বছর নিজের ও পরিবারের যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে যদি কোনো মুসলমানের কাছে নিসাব পরিমাণ অর্থাত্ বছরের আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে যদি কমপক্ষে সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্য অথবা সমমূল্যের ধন-সম্পদ থাকে, তবে বিত্তবানের সম্পদের শতকরা আড়াই টাকা হিসেবে আল্লাহর নির্ধারিত খাতে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করতে হয়-এটাই হলো যাকাত। আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক ধন-সম্পদের ৪০ ভাগের ১ ভাগ অসহায় গরিব-দুঃখীদের যাকাত প্রদান করে রোজাদার আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে থাকেন। যাকাত গরিবের প্রতি ধনীর অনুগ্রহ নয়, বরং তা গরিবের ন্যায্য অধিকার। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘তাদের (সম্পদশালীদের) ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (সূরা আল-যারিআত, আয়াত: ১৯)। যাকাত সমাজে ধনী ও গরিবের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগরণের একটি বিরাট উপকরণ। কোনো ব্যক্তির উপার্জিত অর্থের পুরোটাই এককভাবে তাকে ভোগ করার অধিকার দেওয়া হয়নি, বরং বছরান্তে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ হলে এর দ্বারা গরিব আত্মীয়স্বজন, নিঃস্ব, হতদরিদ্র লোকজনকে সাহায্য করতে হয়, যাতে তারাও উপার্জনক্ষম হতে পারেন। কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী আট প্রকার ব্যক্তি এই যাকাত পাবার প্রাপ্য। যথা :ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী, নওমুসলিম ও অনুরাগী, দাস-দাসী, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, মুজাহিদ ও বিপদগ্রস্ত মুসাফির (সূরা তাওবা, আয়াত-৬০)। যাকাত প্রদান করলে যাকাতদাতার ধন-সম্পদ কিছু কমে না, বরং আল্লাহ এতে অনেক বরকত দান করেন এবং তা বহুগুণ বেড়ে যায়। ইসলামে ধন-সম্পদ বণ্টনের মূলনীতি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘ধন-সম্পদ যেন শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়’ (সূরা আল-হাশর, আয়াত:৭)। ধনী রোজাদার লোকেরা যদি ঠিকমত যাকাত আদায় করেন তাহলে সমাজে কোনো অন্নহীন, বস্ত্রহীন, আশ্রয়হীন, শিক্ষাহীন লোক থাকতে পারে না। সঠিক হিসাব অনুযায়ী যাকাত প্রদান করা হলে পুরো সম্পত্তিই হালাল হয়ে যায়। যাকাত হিসেবে যেকোনো পরিধেয় বস্ত্রের চেয়ে নগদ অর্থ পেলেই মনে হয় গরিব অসহায় মানুষেরা অধিকতর খুশি হবে। যাকাতের নগদ অর্থ দিয়ে তারা প্রয়োজনে পছন্দমাফিক কাপড়-চোপড় ক্রয় করবে, নয়তো সংসার নির্বাহে ব্যয় করে সাময়িকভাবে অভাব দূর করতে পারবে। অনেকে যাকাত হিসেবে শাড়ি-লুঙ্গি অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে যাকাতপ্রার্থীরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেয়ে থাকে। শাড়ি-লুঙ্গির চেয়ে তাদের সাংসারিক অনটন ও দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে উপযুক্ত হারে নগদ অর্থ দ্বারা যাকাত আদায় করা হলে তারা সত্যিকারভাবে উপকৃত হবে।