প্রশ্ন ০৩: আমি একজন চাকরিজীবী। আমার ব্যাংকে এক লাখ টাকা আছে । এছাড়াও আমি প্রতি মাসে ডিপিএসএ ২ হাজার টাকা রাখি । তাছাড়া আমার প্রতি মাসে আরো কিছু টাকা হাতে থাকে । আমার প্রশ্ন হলো, আমি যাকাতের হিসাবটা কিভাবে করবো ? কত টাকার উপর করবো? আমি একটা সহজ হিসাব করতে চাই, সেটা হলো:- মনে করেন, আমি রমজান মাসে যাকাত দিতে চাই, এই রমজানে আমার কাছে যত টাকা আছে সব টাকার যাকাত দেবো। হোক সেটা আমি গত মাসের বেতন থেকে রেখেছি । আবার, এই রমজান থেকে পরবর্তি রমজান পর্যন্ত প্রতি মাসে যা আসবে তা এবং এই বছরের উদ্ধৃত যোগ করে যাকাত দেবো । নিয়মটা যদি শরিয়া সম্মত না হয়, দয়া করে বুঝিয়ে দিবেন…. (প্রতি মাসের জমা টাকা এক বছর পর পর প্রতি মাসে মাসে হিসাব রাখা কষ্টকর মনে হয়, কারন প্রতি মাসের ১০ -১৫ হাজার টাকার হিসাব মনে নাও থাকতে পারে) কৃতজ্ঞ থাকবো।

উত্তরঃ- অন্যের গচ্ছিত আমানত বা বন্ধকী মাল আপনার হেফাজতে থাকলে, বা আপনার কাছে কারো পাওনা অর্থ/সম্পদ (তা ঋণ, বাসাভাড়া, বিদ্যুতবিল, গ্যাসবিল, দোকানবাকী ইত্যাদি যে প্রকারেরই হোক না কেন) থাকলে, বা আপনার প্রদেয় নযর-মানত, কাফফারা, অনাদায়ী যাকাত/ফিতরা, ফিদিয়া ইত্যাদি থেকে থাকলে, সেইসকল অর্থ / সম্পদ আপনার অধিকারে থাকলেও আসলে তা ‘অন্যের সম্পদ’।

আপনার বা আপনার পরিবারের সদস্যদের নিত্য-ব্যবহার্য আসবাবপত্র, তৈজষপত্র, বৈদ্যুতিক ও প্রদর্শনীর সরঞ্জামাদি, পরিধেয় বস্ত্রাদি, বসবাসের বা ভাড়ার গৃহাদি, ফসলী বা অফসলী জমি বা বাগান, দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রক্ষিত বিক্রয়ের জন্য নয় এমন বই-খাতা, চেয়ার-টেবিল, পাত্র ও সাজ-সরঞ্জামাদি ‘নিত্য-ব্যবহার্য দ্রব্যাদি’র অন্তর্ভূক্ত। উল্লেখ্য, সোনা-রোপার অলংকার ‘নিত্য-ব্যবহার্য দ্রব্যাদি’র অন্তর্ভূক্ত নয়; তবে অন্যান্য ধাতু, পাথর বা কাঠের নির্মিত সাজ-সজ্জা, অলংকার ও পরিধেয় বস্তুসামগ্রী ‘নিত্য-ব্যবহার্য দ্রব্যাদি’র অন্তর্ভূক্ত।

ইত্যাকার ‘অন্যের সম্পদ’ ও ‘নিত্য-ব্যবহার্য দ্রব্যাদি’ বাদ দিয়ে আপনার কাছে যদি সাড়ে সাত তোলা (= ৮৭.৫ গ্রাম) সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা (= ৬১২.৫ গ্রাম) রোপা থাকে; অথবা এমন কিছু পরিমাণ সোনা ও কিছু পরিমাণ রোপা থাকে, যার মোট বাজার মূল্য ৬১২.৫ গ্রাম রোপার বাজার মূল্যের সমান; অথবা ৬১২.৫ গ্রাম রোপার বাজার মূল্যের সমান মূল্যের ব্যবসায়িক সম্পদ থাকে; অথবা ৬১২.৫ গ্রাম রোপার সমমূল্যের নগদ অর্থ থাকে; অথবা আপনার কাছে থাকা সোনা, রোপা ও ব্যসায়িক মালের মোট বাজার মূল্য এবং অন্যের কাছে আপনার রক্ষিত আমানত বা পাওনা ঋণের টাকা সহ সাকূল্য নগদ টাকা একত্রিত করলে তার মোট পরিমাণ যদি ৬১২.৫ গ্রাম রোপার বাজার মূল্যের সমান হয়, তাহলে আপনি ‘নিসাব’ (অর্থাৎ, যাকাতযোগ্য সম্পদের ন্যূনতম পরিমাণ)-এর মালিক হিসাবে গণ্য হবেন।

নিসাব বা ততোধিক পরিমাণ যাকাতযোগ্য সম্পদ যদি বিগত এক চান্দ্র বৎসর যাবৎ আপনার কাছে থাকে তাহলে আপনার উপর যাকাত ফরয হয়। ‘নিসাব’-এর মালিকানার মেয়াদ এক চান্দ্র বৎসর পূর্ণ হওয়ার পরই কেবল ঐ বৎসরের যাকাত ফরয হয়ে থাকে। আবার যিনি ‘নিসাব’-এর মালিক নন তার উপর যাকাত ফরয নয়। এক চান্দ্র বৎসর অতিবাহিত হওয়ার পর ‘নিসাব’ ও ততোধিক পরিমাণ সম্পদের শতকরা আড়াই ভাগ হারে যাকাত আদায় করা ফরয। লক্ষণীয় যে, যাকাতের হিসাব প্রতি চান্দ্র বৎসরের যে কোন মাসের নির্দিষ্ট তারিখে করতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, প্রথম বার যাকাতের হিসাব ১লা মুহররম বা ১৫ই রমযান করে থাকলে পরবর্তী বৎসরগুলিতেও একই তারিখে যাকাতের হিসাব করতে হয়।

প্রতি বৎসর যাকাতের হিসাব করে যাকাতের নির্ধারিত পরিমাণটি একটি স্থায়ী হিসাবের খাতায় লিখে রাখতে হয়। যাকাতে ঐ নির্ধারিত অর্থ একসাথে বা পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা যায়। স্থায়ী হিসাবের খাতায় যাকাত হিসাব করার ক্ষেত্রে আরবী ও ইংরেজি তারিখ, ঐ তারিখে সাকূল্য যাকাতযোগ্য সম্পদের বিবরণ ও পরিমাণ, নির্ধারণকৃত যাকাতের পরিমাণ, বিভিন্ন তারিখে যাকাত পরিশোধের পরিমাণ ইত্যাদি লিখে রাখলে প্রতি বৎসর যাকাতের হিসাব করা ও হিসাব রাখা সহজতর হয়।

যেমন, ১৪৪০ হিজরী সালের ১লা মুহররাম যাকাতের হিসাব করে সাকূল্য যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ পাচ লক্ষ টাকা হলে এবং ১৪৪১ হিজরী সালের ১লা মুহররামের আগের দিন পর্যন্ত উক্ত টাকার স্থিতি না কমে থাকলে সেই বৎসরের নির্ধারিত যাকাত সাড়ে বারো হাজার টাকা হয়। ১৪৪১ হিজরী সালের ১লা মুহররামের আগের দিন যাকাতের হিসাব করে সাকূল্য যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ চার লক্ষ টাকা হলে সেই বৎসরের নির্ধারিত যাকাত দশ হাজার টাকা হয়। কারণ, ইতোমধ্যে যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ এক লক্ষ টাকা হ্রাস পাওয়ায় কেবল চার লক্ষ টাকার স্থিতি এক বৎসর পূর্ণ করেছে। আবার ১৪৪১ হিজরী সালের ১লা মুহররামের আগের দিন যাকাতের হিসাব করে সাকূল্য যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ছয় লক্ষ টাকা হলে সেই বৎসরের নির্ধারিত যাকাতও সাড়ে বারো হাজার টাকা হয়। কারণ, ইতোমধ্যে যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ এক লক্ষ টাকা বৃদ্ধি পেলেও কেবল পাচ লক্ষ টাকার স্থিতি এক বৎসর পূর্ণ করেছে।

অন-লাইন ফতওয়ায়ে দারুল উলূম দেওবন্দ, ফতওয়া নং-১৪৫৫৯৩। প্রকাশ —১৩/১১/২০১৬ইং- এর অনুসরনে।