গ্রামে বাড়ছে টাকার প্রবাহ চাঙ্গা হচ্ছে অর্থনীতি

লেখক : মনির হোসেন ও মামুন আব্দুল্লাহ 
উৎস : দৈনিক যুগান্তর
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৫

 

গ্রামে বাড়ছে টাকার প্রবাহ চাঙ্গা হচ্ছে অর্থনীতি

রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এই টাকার বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে ভোগবিলাসে। আর কিছু অংশ বিনিয়োগ হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পভিত্তিক উৎপাদন খাতে। রোজার আগ থেকেই দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাড়তে শুরু করেছে। আর এর বড় অংশই যাচ্ছে গ্রামে। এদিকে অর্থবছর শেষ পর্যায়ে হওয়ায় সরকারি খাতের বরাদ্দ অর্থ খরচ করার ধুম পড়েছে। এর একটি বড় অংশও যাচ্ছে গ্রামে। সরকারি-বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতনের একটি অংশ ইতিমধ্যে গ্রামে চলে গেছে। বেতন-বোনাসের আরও একটি বড় অংশ ঈদের আগেই যাবে গ্রামে। ঈদ ও রোজার বাড়তি খরচ মেটাতে কৃষকের ঘরে মজুদ ধান বা অন্যান্য ফসলের একটি অংশ এখন বিক্রি করা হচ্ছে। রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলের আম-লিচু বিক্রির টাকাও যাচ্ছে ওই অঞ্চলের গ্রামগুলোতে। অর্থবছরের শেষ সময় হওয়ায় কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি টাকা বিতরণ করতে হচ্ছে। এছাড়া রাজনীতিবিদদের নানা কর্মসূচির কারণেও গ্রামে টাকার প্রবাহ রাড়ছে। সব মিলে নানাদিক থেকে অর্থ আসায় গ্রামের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠছে।

গ্রামীণ কুটির শিল্প : রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে পণ্য উৎপাদনের ধুম পড়েছে। কারণ ঈদের কারণে এগুলোর বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির চাহিদা রয়েছে দেশব্যাপী। এ চাহিদা মেটাতে ওই এলাকায় তাঁত মালিক ও তাঁতিদের ঘুম নেই। বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের লুঙ্গি ও তাঁতের কাপড় সারা দেশে ব্যাপকভাবে চলছে। তাই এদের হাতেও কাজের চাপ। মুন্সীগঞ্জের রুহিতপুরী তাঁতের কাপড়ের চাহিদাও তুঙ্গে। গাজীপুরের কালীগঞ্জের টাওয়ালের চাহিদা ঈদের সময় ব্যাপক। নরসিংদীর বাবুরহাটে ক্রেতার চাপ সামলাতে জেলা প্রশাসন থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। একই অবস্থা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তাঁতের পাইকারি বাজারে। রূপগঞ্জের রূপসীর জামদানি শাড়ি সারা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও চলে যাচ্ছে। তাঁতের তৈরি কাপড়ের চাহিদা বাড়ায় ঢাকা কেন্দ্রিক ফ্যাশন হাউস ও বস্ত্র ব্যবসায়ীরা এখন তাঁতিদের কাছ থেকে কাপড় সংগ্রহ করছেন। এসব মিলে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলোও এখন বেশ জমে উঠেছে। ব্যাংকের তথ্যানুসারে দেশের ৫৭টি ব্যাংকের সারা দেশে ৮ হাজার ৮৪৯টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ শাখা ৫ হাজার ৪৯টি। যা মোট শাখার ৫৭ দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতে শহুরে শাখার চেয়ে গ্রামীণ শাখাই বেশি। ব্যাংকগুলোতে গ্রামের আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং ঋণের পরিমাণ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। রোজা ও ঈদ উপলক্ষে এ টাকার একটি অংশও গ্রামে খরচ হবে। এছাড়া এনজিও ও গ্রামীণ ব্যাংক থেকেও টাকার প্রবাহ বাড়বে। গ্রামীণ ব্যাংক তাদের সদস্যদের চাহিদানুযায়ী টাকার জোগান দিতে ইতিমধ্যে প্রস্তুতি নিয়েছে।

রেমিট্যান্স : রোজায় প্রতিবছরই রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ে। রমজান ও ঈদে বাড়তি খরচের জন্য প্রবাসীরা তাদের স্বজনদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ পাঠায়। এর বড় অংশই যায় গ্রামে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে মোট রেমিট্যান্সের ৩২ শতাংশই যাচ্ছে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে। এরপর বেশি যাচ্ছে বৃহত্তর চট্টগ্রামে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ২০১২ সালের ২০ জুলাই রোজা শুরু হয়। রোজা শুরুর আগের মাসে জুনে রেমিট্যান্স এসেছিল ১০৭ কোটি ডলার। কিন্তু রোজার শুরুর মাস জুলাইয়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ১২০ কোটি ১২ লাখ ডলার। এর পরের মাসে আগস্টে তা আবার কমে দাঁড়ায় ১১৭ কোটি ডলার। ২০১৩ সালে রোজা শুরু হয় ৯ জুলাই। ওই বছরের জুনে রেমিট্যান্স এসেছিল ১০৫ কোটি ডলার। রোজার শুরুর মাস জুলাইয়ে এসেছিল ১২৩ কোটি ৮১ লাখ ডলার। পরের মাস আগস্টে তা কমে ১০০ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০১৪ সালের রোজা শুরু হয়েছিল ৩০ জুন। এর আগে মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১২১ কোটি ডলার। জুনে তা ১২৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। আবারও জুলাইয়ে আরও বেড়ে ১৪৯ কোটি ২৫ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। পরের মাস আগস্টে রেমিট্যান্স কমে ১১৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলারে নেমে আসে। চলতি বছরের ১৯ জুন থেকে রোজা শুরু হয়েছে। রোজা শুরুর আগের মাসে অর্থাৎ মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩১ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। চলতি মাসের ১২ জুন পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৬০ কোটি ৪২ লাখ ডলার। বাংলাদেশ সূত্র বলছে, মাস শেষে রেমিট্যান্স বাড়বে।

যাকাত : এফবিসিসিআইর হিসাবে প্রতিবছর যাকাত ও ফিতরা বাবদ খরচ হচ্ছে ৬০ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা। এ টাকার বড় অংশই চলে যায় গ্রামে। রোজা ও ঈদে নানা কর্মসূচিতে শহরের চাকরিজীবীরা গ্রামে যাচ্ছেন। যে কারণে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এছাড়া গ্রামের দরিদ্র মানুষের সহায়তায় শহরের লোকজন সাধ্য অনুযায়ী অর্থের জোগান দিচ্ছে।

রাজনৈতিক নেতাদের ঈদ বকশিশ : রমজান এবং ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এটি তাদের রাজনীতিরই অংশ। ঈদ শুভেচ্ছায় তারা কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেন। এসব নেতাকর্মীদের ঈদ শুভেচ্ছার ডিজিটাল ব্যানার, পোস্টার, বোর্ড গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানানো হয়। আবার অনেক নতুন মুখ রাজনীতিতে পরিচিত হওয়ার জন্য ঈদ শুভেচ্ছায় অঢেল টাকা ব্যয় করেন। এছাড়া মানুষের দৃষ্টি আর্কষণের জন্য গরিব, দুস্থ, এতিমদের পাশে দাঁড়ান তারা।

মৌসুমী ফল বিক্রির টাকা : কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য মতে, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। এরমধ্যে রাজশাহীতে ২ লাখ ৫৭ হাজার টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২ লাখ ৬০ হাজার টন। উৎপাদিত আমের মূল্য প্রায় ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা। এ ছাড়াও লিচু, কাঁঠাল, জাম, আনারস এবং জামরুলসহ সব মৌসুমী ফল বিক্রির টাকাও গ্রামে যাচ্ছে। এতে করে ওইসব অঞ্চলের অর্থনীতি এখন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

কৃষিঋণ : চলতি অর্থবছরে সরকারের কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে বিতরণ করা হয়েছে ১০ হাজার ২০২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। যা মোট ঋণের ৭২ শতাংশ। ফলে জুনের মধ্যে আরও ২৮ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে হবে। এ হিসাবে টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। আর বাড়তি ঋণ বিতরণের জন্য ব্যাংকগুলো চাপে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কৃষিঋণের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ চলে যায় ভোক্তা খাতে।

সরকারি বরাদ্দ : চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা। এ টাকা ব্যয় হচ্ছে ভিক্ষাবৃত্তির অবসান, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বয়স্কভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বিধবা ভাতা, এতিম শিশুদের জন্য বরাদ্দ, উপবৃত্তি, একটি বাড়ি একটি খামার, অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান, ভিজিডি, ভিজিএফ, কাবিখা ইত্যাদি খাতে। এর সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। যাদের বাস গ্রামে। তাই সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে বরাদ্দের টাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। সুবিধাভোগীরা প্রাপ্ত টাকার একটা অংশ সঞ্চয় করে রাখেন রমজান এবং ঈদে খরচের জন্য। এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রমজান এবং ঈদের মতো উৎসব এলেই বাড়তি টাকার প্রবাহে সচল হয়ে উঠে গ্রামের অর্থনীতি। ফলে নিু আয়ের মানুষের হাতেও টাকা যাচ্ছে। এতে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। এটি ইতিবাচক দিক। তবে বাড়তি টাকার প্রবাহের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এ কারণে ঈদের পরে ওই টাকা উৎপাদন খাতে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ থাকা জরুরি।