যাকাত সম্প্রসারণ কার্যক্রম

আর্থিক ইবাদত যাকাত

লেখক : মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ, বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর।
উৎস : দৈনিক ইত্তেফাক
প্রকাশ : ১০ জুলাই, ২০১৫ ইং ০০:০০ মিঃ

 

আর্থিক ইবাদত যাকাত

মহান আল্লাহ সমীপে মানুষের সব সামর্থ্য সবিনয়ে সমর্পণ হলো ‘ইবাদত’। পবিত্র রমজানের অনুষঙ্গ ‘যাকাত’ একটি আর্থিক ইবাদত। অধিকাংশের মতে, হিজরি ৫ম সালে যাকাত ফরজ হয়। ইসলামের পঞ্চভিত্তির অন্যতম যাকাত, একটি সুদবিহীন ও শোষণ-দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের বাহন এবং ‘সামাজিক বীমা’। ০২.৫% যাকাত দানে ০৫% হারে দারিদ্র্যহ্রাস সম্ভব। পবিত্র কুরআনে নামাজের পর সর্বাধিক সংখ্যক আয়াতে ৩২ বার যাকাত শব্দ, ১২ বার পারিভাষিক অর্থে ও অসংখ্যবার অপারিভাষিক অর্থে উল্লেখিত। পবিত্র কুরআনে যাকাতকে ‘বঞ্চিত ও মুখাপেক্ষীর অধিকার’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করায় প্রিয়নবী (স) মু’য়াজকে (রা) দেয়া নির্দেশে বলেন, “এটা হচ্ছে ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করে দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা”।

শাব্দিক অর্থে যাকাতের দ্বারা পবিত্রতা ও বৃদ্ধি বোঝায়। সাড়ে সাত তোলা বা ভরি (৮৭.৪৫ গ্রাম) স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা ভরি (৬১২.৫৩ গ্রাম) রৌপ্য, ব্যবসার পণ্য অথবা সমমূল্যের নগদঅর্থ যা সাংবাত্সরিক দৈনন্দিন আহার-বিহার ঘর গৃহস্থলির প্রয়োজনের অতিরিক্ত এবং তা কোনো প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক, ঋণমুক্ত, স্বাধীন মুসলমানের মালিকানায় এক বছর অতিবাহিত হলেই তাকে যাকাত দিতে হবে। সুরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে যাকাতের হকদারদের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তারা হলেন-ফকির, মিসকিন, নওমুসলিম, মুসাফির, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, ক্রীতদাস ও মুজাহিদ। এই যাকাত উপকার লাভের আশা ছাড়াই দান করতে হবে তথা তাদেরকে ঐ সম্পদের মালিক বানিয়ে দিতে হবে। মুসলমানের সব ‘বৈধ ও পবিত্র’ সম্পদের যাকাত রয়েছে। যেমন (ক) নগদ অর্থ, ব্যাংক নোট বা সঞ্চয়, শেয়ার, স্টক, (খ) উত্পাদিত ফসল, (গ) ব্যবসার মাল, অংশিদারী মূলধন, (ঘ) গৃহপালিত পশু, (ঙ) স্বর্ণ-রৌপ্য ও অলঙ্কারাদি, (চ) খনিজ সম্পদ, গুপ্তধন ইত্যাদি। যাকাত নির্ধারণী একককে ‘নিসাব’ বলে। সম্পদের প্রকৃতি অনুযায়ী আলাদা নিসাবের বিপরীতে ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণের যাকাত ধার্য হয়। তবে যাকাত ও ট্যাক্স আলাদা বিষয় এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট। রাষ্ট্রীয় সেবা গ্রহণের কারণে ট্যাক্স পরিশোধের দ্বারা যাকাতের দায়মুক্তি ঘটে না।

স্বর্ণ, রৌপ্য ও নগদঅর্থকে একক নির্ধারণ করে যাকাত ধার্য হয়। যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা ভরি রৌপ্যের বাজার মূল্য (১২০০৫২.৫) তেষট্টি হাজার টাকা হয়, তবে এমন নগদঅর্থ সম্পদের অধিকারীর জন্য ১৫৭৫/- টাকা যাকাত আদায় করা ফরজ। উচ্চতম একক হিসেবে সাড়ে সাত তোলা বা ভরি স্বর্ণের বাজার মূল্য (৪৩,২০০৭.৫) তিন লক্ষ চব্বিশ হাজার টাকা হলে অথবা আরো বেশি সম্পদের অধিকারী হলে তারও ০২.৫% বা প্রতি এক লক্ষ টাকায় ২৫০০/- টাকা যাকাত আদায় করা ফরজ। স্বর্ণের পরিমাণ কম-বেশি হলে তার সঙ্গে নগদঅর্থ ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদকে হিসেবে এনে ঐ সম্পদের আর্থিক মূল্যমান রৌপ্যের বাজার মূল্যের পরিমিত এককে হিসেব করে যাকাত আদায় করতে হবে। তবে শুধু পরিমাণ নয়, নতুন পুরান স্বর্ণের বাজারমূল্যের পার্থক্য, খাদ ও তৈরির মজুরি ছাড়া নিরেট নগদ বিক্রয় মূল্যের হিসেবে যাকাত দিতে হবে।

‘অলংকার’ ব্যবহূত বা অব্যবহূত যেভাবেই থাক, ঐগুলোর জন্য যাকাত দিতে হবে। কেননা, মহান আল্লাহ্ বলেন, “যারা সোনা রূপা সঞ্চয় করে এবং তা আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করে না তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি…”(তওবা: ৩৪, ৩৫)। এ আয়াত অবতীর্ণ হলে প্রিয়নবী (স) বলেন, “ধ্বংস হোক স্বর্ণ, ধ্বংস হোক রৌপ্য”। তিরমিযি শরিফে আছে, প্রিয়নবী (স) বলেন, “হে নারী সমাজ। তোমরা তোমাদের অলংকারের যাকাত দাও। কেননা, আমি তোমাদের অধিকাংশকে জাহান্নামি দেখেছি”। আয়েশা (রা)  থেকে বর্ণিত, একদা রাসুল (স) আমার হাতে রূপার কারুকাজ করা একটি কম্বল দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “এর কি যাকাত দেয়া হয়েছে”? আমি বললাম: না… তিনি (স) বললেন, “এটাই তোমার জাহান্নামে যাবার জন্য যথেষ্ট” (মুস্তাদরাক)। বর্ণিত আছে ‘যে সম্পদের যাকাত দেয়া হয়নি তাকে বিষধর সাপে রূপান্তর করে ঐ সম্পদের মালিকের গলায় জড়িয়ে দেয়া হবে এবং সাপটি তাকে ছোবল দিতে দিতে বলবে: “আমি তোমার প্রিয় সম্পদ, গুপ্তধন…” (বুখারি)।

হযরত আবুবকরের (রা) খিলাফতকালে ধর্মোদ্রোহী ও যাকাত অস্বীকারকারীর উদ্ভব হলে তিনি সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে বলেছিলেন, “ধর্মের ক্ষতি হবে অথচ আমি জীবিত ! আল্লাহ্র শপথ। আমি তাদের সঙ্গে লড়েই যাবো যারা নামাজ ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করে… যদি তারা একটি উটের রশি পরিমাণ বস্তুরও যাকাত দানে অস্বীকৃতি জানায়” (আবুদাউদ, মেশকাত)। তাঁর এমন দৃঢ়তার জন্য তাঁকে ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ বলা হয়। তবে রাষ্ট্র ব্যক্তির প্রকাশ্য ও প্রদর্শিত আয়ের যাকাত আদায় করে। অনিরূপিত, অপ্রকাশ্য সম্পদকে ইসলামে ‘আমওয়ালে বাতিনা’ বলে, এমন সম্পদের যাকাত পরিশোধ ঈমানদারের ব্যক্তিগত দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতির ক্ষেত্রেও ব্যক্তিকে স্বউদ্যোগে যাকাত আদায় করে দায়মুক্ত হতে হবে। মনে রাখা ভালো, হারাম সম্পদ-বস্তুর যাকাত নেই এবং এগুলোর যাকাত দিলেই তা হালাল হয়ে যায় না। কেননা, ইসলাম ‘কালো টাকা সাদা করবার’ দর্শন সমর্থন করে না। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ্ বলেন, “যে মালের যাকাত আদায় করবে, সে অবশ্যই প্রতিদান পাবে। যে আদায় করবে না, আমি তার অংশ থেকে (অন্য কোন উপায়ে) অবশ্যই তা আদায় করে নেব (আহমদ, আবুদাউদ, নাসাঈ)

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলো ব্যবহার করতে পারেন।

Share on facebook
ফেইসবুক
Share on twitter
টুইটার
Share on email
ইমেইল

স্বর্ণ এবং রৌপ্যের
বর্তমান বাজার মূল্য

আইটেমের নাম টাকা/ভরি টাকা/গ্রাম
স্বর্ণ ২২ ক্যারেট ৭৩,৪৮৬ ৬৩০০
স্বর্ণ ২১ ক্যারেট ৭০,৩৩৬ ৬০৩০
স্বর্ণ ১৮ ক্যারেট ৬১,৫৮৮ ৫২৮০
রৌপ্য ২১ ক্যারেট ১,৪৩৫ ১২৩
উৎস / সূত্র: বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি

অনুসন্ধান