যাকাত পরিচিতি

যাকাত আরবী শব্দ। দুররুল মুখ্তার কিতাবে আছে, যাকাতের আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। তাছাড়া যাকাতের আরো অর্থ রয়েছে; যেমন, বরকত ও প্রশংসা। এই সবগুলো অর্থই ইসলামী শরীয়তে যাকাতের পারিভাষিক অর্থে বিদ্যমান। কেননা, যাকাতের মাধ্যমে যাকাতদাতা গোনাহ থেকে ও কৃপণতার দোষ থেকে পবিত্র হয় এবং তার সম্পদ বর্জ্য অংশ থেকে পরিশুদ্ধ হয়। সূরা তাওবার ১০৩নং আয়াতে রাসুলে আকরাম (সাঃ)-কে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেন: “আপনি ধনীদের সম্পদ থেকে সাদাকা সংগ্রহ করে তাদেরকে পবিত্র করুন এবং গরীবদের সম্পদ বৃদ্ধি করুন।” যাকাতের ফলস্বরূপ দুনিয়াতে দরিদ্রের এবং আখিরাতে ধনীর সম্পদ বৃদ্ধি পায়। আল- কুরআনের সূরা সাবার ৩৯নং আয়াতে আছে, “তোমরা যা কিছু দান কর তিনি তার বিনিময় দেন।” সূরা মুযযাম্মিলের ২০ নং আয়াতে আছে, “তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। তোমরা নিজেদের জন্য যা কিছু আগে পাঠাবে তা আল্লাহর কাছে উত্তম আকারে ও পুরস্কার স্বরূপ বর্ধিত ভাবে পাবে।” যাকাতের মাধ্যমে সম্পদে বরকত হাসিল হয়। মুসনাদে আহমদে আছে, সাদকা দিলে কখনও সম্পদ হ্রাস পায় না। যাকাতদাতা প্রশংসিত হয়ে থাকেন। তার সম্পর্কে লোকে ভালো আলোচনা করে। সূরা আ‘লার ১৪নং আয়াতে আছে, “যে পবিত্রতা অর্জন করে, সে সাফল্য লাভ করে।”

কুরআন ও হাদীস থেকে জানা যায়, যাকাতের ফলে ধন-সম্পদে সমৃদ্ধি ও বরকত হয়। অধিকন্তু যাকাত প্রদানের মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি লাভ করে। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় সম্পদের যে অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করা মুসলিমদের উপর অবশ্য কর্তব্য (ফরয) করা হয়েছে তা-ই যাকাত। ইসলামি আইনশাস্ত্রে এই অর্থেই যাকাত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। তফসীরকারগণ যাকাতরূপে প্রদত্ত সম্পদ এবং যাকাত প্রদানের কাজ উভয়টিকেই ‘যাকাত’রূপে আখ্যায়িত করেছেন।

হানাফী গবেষকদের মতে, নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক চান্দ্র বৎসর কারো স্বত্বাধিকারে থাকলে সেই সম্পদের যে অংশে কোন বিশেষ শ্রেণীর মানুষের হক সৃষ্টি হয় সেই অংশ হস্তান্তর করার নাম যাকাত। শাফিয়ী গবেষকদের মতে, সম্পদ বা গবাদি পশু থেকে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ দান করা হয় তা-ই যাকাত। মালিকী গবেষকদের মতে, কোন বিশেষ প্রকারের সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে তা থেকে হকদারদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণে পৃথক করে দেয়ার নাম যাকাত। আর হাম্বলী গবেষকদের মতে, কোন বিশেষ পরিমাণ সম্পদে কোন বিশেষ শ্রেণীর লোকের কোন বিশেষ সময়ে অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার নাম যাকাত।

যাকাতের গুরুত্বঃ
যাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। ঈমান সম্পর্কিত সাক্ষ্য প্রদান ও সালাতের পরই এর স্থান। সালাত যেমন ফরয, যাকাতও তেমন ফরয। আল-কুরআনের বহু স্থানে সালাতের আদেশের সঙ্গে সঙ্গেই যাকাতের আদেশ প্রদান করা হয়েছে। হিজরতের পূর্বে নবুওয়াতের প্রথম ভাগে আল-কুরআনে যেসকল সূরা নাযিল হয়েছিল সূরা মুযযাম্মিল সেগুলির অন্যতম। এই সূরায়ও যাকাত দেয়ার নির্দেশ আছে। যাকাত সংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশাবলী নাযিল হওয়ার পূর্বে মহানবী (সাঃ) ও সাহাবীগণ নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন-সম্পদ প্রায়শঃই দান করে দিতেন। সূরা বাকারার ২১৯ আয়াতে আছে, “তারা আপনার কাছে জানতে চায়, তারা কি দান করবে? আপনি বলে দিন, তোমাদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পর যা উদ্বৃত্ত থাকে তাই দান কর।”

অতঃপর আল-কুরআনের সূরা তাওবার ১০৩ নং আয়াত নাযিল হওয়ার পর যাকাত আদায় ও তা নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করা মুসলিমদের উপর ফরয কর্তব্যরূপে নির্ধারিত হয়। সালাত ও যাকাত – এই দু’টি ইবাদতই ইসলামী জীবনের প্রাথমিক নিদর্শন। কোন সম্প্রদায় যদি সামগ্রিকভাবে তা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে তাহলে সে সম্প্রদায় মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্ভূক্ত থাকে না। এই কারণে হযরত আবূ বকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল তাদের বিরুদ্ধে সাহাবীগণ (রাঃ) ঐকমত্যে জিহাদ ঘোষণা করেছেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ কালে হযরত আবূ বকর (রাঃ) বলেছিলেন, “আল্লাহর শপথ! যে ব্যক্তি সালাত যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করে, আমি তার বিরুদ্ধে অবশ্যই জিহাদ করবো।”(বুখারী ও মুসলিম)।

হিজরী ৮ম সনে যাকাত ও সাদাকা সংগ্রহ ও তা যথোপযুক্ত পাত্রে ব্যয়ের দায়িত্বভার মুসলিমদের ইমামের উপর অর্পণ করে সূরা তাওবার আয়াত নাযিল হয়। রাসূল আকরাম (সাঃ)-এর জীবদ্দশায় এই দায়িত্ব নিজেই পালন করতেন।

তাঁর ওফাতের পর খলিফা তথা মুসলিমদের ইমামের উপর এই দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যাকাত সংগ্রহ কার্যক্রম মক্কা বিজয়ের পর অবলম্বন করা হয়েছিল।

যাকাত আধুনিক রাষ্ট্র নির্ধারিত আয়কর নয়ঃ
যাকাত প্রত্যেক স্বাধীন সুস্থমস্তিষ্ক প্রাপ্তবয়স্ক নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী মুসলিম নর-নারীর জন্য আল্লাহর নির্দেশিত কর্তব্য, তথা অন্যতম ফরয ইবাদত। যাকাত মানুষকে পাপ-পংকিলতা থেকে মুক্তি দানের লক্ষ্যে প্রবর্তিত হয়েছে। এর দ্বারা দুই ধরনের উপকার হয়। প্রথমতঃ যাকাত প্রদানকারী পাপ, ধনলিপ্সা এবং ধনের প্রতি অত্যধিক আসক্তি জনিত চারিত্রিক রোগসমূহের দোষ থেকে মুক্তি পেয়ে থাকে। দ্বিতীয়তঃ সমাজের দীন-দরিদ্র, অনাথ শিশু, বিধবা নারী, বিকলাঙ্গ, উপার্জনে অক্ষম নারী-পুরুষ, ফকীর-মিসকীন প্রভৃতি যারা অত্যাবশ্যক জীবনোপকরণ সংগ্রহ করতে অসমর্থ, এমন নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্থ ব্যক্তিরা এই যাকাত দ্বারা লালিত-পালিত হয়ে থাকে। যাকাত প্রদানকারীর কল্যাণ সাধনই ইসলামী যাকাত ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য এবং দ্বিতীয় প্রকার কল্যাণ আনুষঙ্গিকভাবে সাধিত হয়ে থাকে। এইজন্যেই কোন স্থানে বা কোন সময়ে যাকাত গ্রহণকারী লোকের সন্ধান পাওয়া না গেলেও ধনীদের উপর যাকাত প্রদানের আদেশ সমভাবে বলবৎ থাকে।

কোন প্রকারের সম্পদ কি পরিমাণে কতদিন অধিকারে থাকলে যাকাত দিতে হয় এবং যাকাতের হার কিরূপ ইত্যাদি সম্বন্ধে ওহীর মাধ্যমে অবগত হয়ে রাসূলে করীম (সাঃ) উম্মতকে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছেন। কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) তা লিখেও রেখেছেন। আল-কুরআনের দৃষ্টিতে যাকাত ফকীর, মিসকীন ও অভাবগ্রস্থদের প্রাপ্য। এটি যাকাত গ্রহীতাদের প্রতি যাকাতদাতাদের ঐচ্ছিক দান নয়; বরং এটি আবশ্যিক ব্যয়। তাই আল-কুরআনের অসংখ্য আয়াতে এজাতীয় দান বুঝাতে ‘ব্যয় বা খরচ’ অর্থবোধক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

যাকাতের নিসাবঃ
যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত ফরয হয়, ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় তাকে নিসাব বলা হয়। রূপার নিসাব দুইশত দিরহাম। দিরহাম হলো ০.৭ মিসকাল ওজন বিশিষ্ট রৌপ্যমূদ্রা। আর প্রতি মিসকালের ওজন ম্যাট্রিক পদ্ধতিতে ৪.৩৭৪ গ্রাম, মতান্তরে ৪.২৫ গ্রাম। আমাদের দেশে মিসকালের ওজন ৪.৩৭৪ গ্রাম হিসাবে রূপার নিসাব ৬১২.৩৫ গ্রাম বা প্রায় সাড়ে বায়ান্ন তোলার সমান ধরা হয়। মিসকালের ওজন ৪.২৫ গ্রাম হিসাবে রূপার নিসাব ৫৯৫ গ্রাম হয়।

সোনার নিসাব বিশ দিনার। দিনার হলো ১ মিসকাল ওজন বিশিষ্ট স্বর্ণমূদ্রা। আমাদের দেশে মিসকালের ওজন ৪.৩৭৪ গ্রাম হিসাবে সোনার নিসাব ৮৭.৪৮ গ্রাম বা প্রায় সাড়ে সাত তোলার সমান ধরা হয়। মিসকালের ওজন ৪.২৫ গ্রাম হিসাবে সোনার নিসাব দাঁড়ায় ৮৫ গ্রাম। সুদী ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার কারণে মহানবী (সাঃ)-এর সময়ে সোনা-রূপা দ্বারা তৈরী দিনার-দিরহামের মূদ্রাগত মূল্য এবং বস্তুগত মূল্য সমান থাকায় পরবর্তীকালে সোনা-রূপার নিসাব দিনার-দিরহামের ওজন নির্ভরেই নিরূপিত হয়েছে। পণ্যদ্রব্যের নিসাবও এর মূল্যের উপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়েছে। সুতরাং ব্যবসাপণ্যের নিসাবও সোনা বা রূপার নিসাবের ন্যায়। অনূন্য নিসাব পরিমাণ ধনসম্পদ এক চান্দ্র বৎসরকাল যাবৎ পূর্ণ মালিকানায় থাকলে সেই সম্পদের মালিকের উপর যাকাত ফরয হয়ে থাকে। জমি থেকে উৎপাদিত/প্রাপ্ত ফসল, ফল-ফলারি ও খনিজদ্রব্যের ক্ষেত্রে চান্দ্র বৎসর পূর্ণ হতে হয় না।

ভারতীয় উপমহাদেশে সুলতান শের শাহ সূরীর শাসনামলে (১৫৪০-১৫৪৫ইং) ‘রূপী’ নামীয় রৌপ্যমূদ্রার প্রচলন শুরু হয়। তখন রূপীতে এক তোলা রোপা ব্যবহার হতো। পরবর্তীতে ১৮৩৩ ইংরেজি সনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পাণী বৃটিশ ভারতে এক তোলা রোপার ওজনবিশিষ্ট রূপী চালু করে, যার ওজন ১১.৬৬৩৮০৩৮ গ্রামের সমান। সেই হিসাবে আমাদের দেশে সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রোপাকে যাকাতের নিসাবরূপে ধার্য করা হয়েছে। আমাদের দেশে নিকট অতীতেও আট রত্তিতে এক মাষা, ছয় রত্তিতে এক আনা, বার মাষায় বা ষোল আনায় এক তোলা, পাঁচ তোলায় এক ছটাক, চার ছটাকে এক পোয়া, চার পোয়ায় বা আশি তোলায় এক সের, চল্লিশ সেরে এক মন ইত্যাকার পরিমাপ প্রচলিত ছিল।

যাকাতের পরিমাণঃ
সোনা-রূপার ও পণ্যদ্রব্যের যাকাত চল্লিশ ভাগের একভাগ। নদী বা বৃষ্টির পানি দ্বারা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক উপায়ে সিঞ্চিত পানি দ্বারা উৎপন্ন ফসলের যাকাত দশভাগের একভাগ। কৃষক যে জমিতে নিজ সেচ ব্যবস্থাপনায় ফসল উৎপাদন করে সেই জমিতে উৎপন্ন শস্যের যাকাত বিশ ভাগের একভাগ। অ-মুসলিম শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়লব্ধ ধন-সম্পদ, খনিজদ্রব্য ও ভূগর্ভস্থ সম্পদের যাকাত এক-পঞ্চমাংশ।

মাঠে চরে খাওয়া গবাদি পশুর মধ্যে উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়ার এবং হানাফী মাযহাব মতে ঘোড়ারও যাকাত দিতে হয়। উট পাঁচটি, গরু বা মহিষ বা উভয়ে মিলে ত্রিশটি এবং ছাগল বা ভেড়া বা উভয়ে মিলে চল্লিশটি হলে পশুসম্পদের নিসাব পূর্ণ হয়। নিসাব পরিমাণ বা ততোধিক পশুসম্পদ এক বৎসর পূর্ণ হলে তার যাকাত দিতে হয়। পাঁচ থেকে নয়টি উটের যাকাত একটি ছাগল, ত্রিশটি গরু-মহিষের যাকাত একটি এক বছর বয়স্ক বাছুর এবং চল্লিশ থেকে একশ বিশটি ছাগলের যাকাত একটি ছাগল। গবাদি পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে যাকাতও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। প্রতিটি ঘোড়ার যাকাত একদীনার অথবা ঘোড়ার মূল্যের চল্লিশ ভাগের একভাগ।

যাকাতের ব্যয়ের খাতঃ
যাকাত বিতরনের খাতসমূহ স্বয়ং আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এজন্যই নির্ধারিত খাত ছাড়া অন্যত্র যাকাতের সম্পদ ব্যয় করা যায় না। যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহ নির্ধারণে সূরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন : “সাদাকা (যাকাত) তো কেবল ফকীর (নিঃস্ব), মিসকীন (অভাবগ্রস্থ) ও যাকাত সংশ্লিষ্ট কর্মচারী এবং যাদের চিত্ত আকর্ষণ একান্ত প্রয়োজন তাদেও হক। তাছাড়া দাস-মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্যে এবং আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী ও মুসাফির (পর্যটক)-দের জন্য। এটি আল্লাহর নির্ধারিত ফরয বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”

এক ব্যক্তি রসূলে করীম (সাঃ)-এর কাছে কিছু যাকাত পাওয়ার আবেদন করলে রাসূল (সাঃ) বললেন : “আল্লাহ যাকাতের খাত ধার্য করার ভার কারও উপর, এমনকি কোন নবীর উপরও অর্পণ করেননি; বরং আল্লাহ স্বয়ং যাকাত বিতরণের আটটি খাত নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তুমি এই আট প্রকার লোকের অন্তর্ভূক্ত হলে তোমাকে দিতে পারি।” (কু’রতুবী, ৮ম খ-, পৃষ্ঠা ১৬৮)।

ফকীর ও মিসকীন উভয় শব্দের দ্বারা দরিদ্র বুঝায়। মিসকীন অর্থ যার কিছুই নাই, অর্থাৎ নিঃস্ব। ফকীর অর্থ অভাবগ্রস্থ, যার নিসাব পরিমাণ অর্থ-সম্পদ নাই। কিন্তু শাব্দিক অর্থের এইরূপ পার্থক্য যাকাতের বিধানে কোনরূপ পার্থক্য সৃষ্টি কওে না। কারণ, যাকাত পাওয়ার বেলায় এই উভয় শ্রেণীই সমভাবে অধিকারী।

যাকাত গ্রহীতার জন্য শর্ত হলো, মুসলিম হওয়া এবং নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না থাকা অথবা অন্ততঃপক্ষে এই পরিমাণ সম্পদ আয়ত্তে না থাকা । তবে, যাকাত সংগ্রহ, বিতরণ, সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে সকল কর্মচারী নিযুক্ত থাকেন, অভাবগ্রস্ত না হওয়া সত্ত্বেও যাকাতের সম্পদ থেকে তারা পারিশ্রমিক পেতে পারেন।

লক্ষ্যণীয় যে, কোন ব্যক্তি স্বয়ং বা তার প্রতিষ্ঠিত কোন সমিতি/সংগঠন/ ট্রাস্ট ইত্যাদির মাধ্যমে যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের কাজে সময়-মেধা- শ্রম ব্যয় করলে তিনি স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে যাকাতের সম্পদ নিজের জন্য বা তার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পারিশ্রমিক স্বরূপ নিতে পারেন কি না তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে স্বার্থচিন্তা থাকার বিষয়টি অসম্ভব নয়।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির নিকট ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ধন না থাকলে তা পরিশোধের জন্য তাকে যাকাত দেয়া যাবে। তবে শরীয়ত পরিপন্থী কোন কাজের জন্য ঋণ করে থাকলে সেই ঋণ পরিশোধের জন্য যাকাত দেয়া যায় না। কারণ, তাতে পাপ কাজে ও অপব্যয়ে প্রনোদনা বা উৎসাহ দেয়া হয়।

উল্লিখিত আয়াতে “আল্লাহর পথে” কথা দ্বারা সেইসব গাযী ও মুজাহিদকে বুঝানো হয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফার আহ্বানে সাড়া দিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় আসবাব ক্রয় করার সামর্থ যার নাই। ইসলামী শিক্ষার প্রসার এবং ইসলামের প্রচার কার্যও এই খাতের অন্তর্ভূক্ত। যদি যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত কোন দরিদ্র ব্যক্তি এইসব কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন, তাহলে যাকাতের মাল থেকে তাকে সহায়তা করা যায়।

যে মুসাফির প্রবাসে অভাব-অনটনে নিপতিত হয়েছে এবং নিজের বাড়ীতে ফেরা মতো প্রয়োজনীয় ধন তার কাছে নাই, বাড়ীতে তার প্রচুর ধন-সম্পত্তি থাকলেও তাকে এই পরিমাণ যাকাত দেয়া যায় যা দিয়ে সফরের কাজ সমাধা করে সে নিজের বাড়ীতে পৌঁছতে পারে।

যাকাত আদায় সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ বসবাসের ঘর, ঘরের তৈজষপত্র, নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র, বইপত্র, কাপড়-চোপড়, আসবাবপত্র ও ঋণের দেনা বাদ দিয়ে নিজের সমস্ত সম্পদ তা নিজের হাতেই থাকুক আর ব্যাংকে বা অন্য কারো কাছে ঋণের পাওনা হোক সবকিছুই নিসাবের হিসাবে অন্তর্ভূক্ত হয়। যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত ব্যক্তিকে যাকাতরূপে প্রদত্ত সম্পদে পূর্ণ স্বত্ববান করে এবং গ্রহীতার কাছ থেকে প্রতিদানের আশা না রেখে, কেবল আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য যাকাত দিতে হবে। অন্যথায় যাকাত আদায় হবে না।

মহানবী (সাঃ)-এর বংশের কাউকে অর্থাৎ, বনু হাশিম বংশের কোন সদস্যকে যাকাত দিলে যাকাত আদায় হবে না। কারণ, রাসূলে করীম (সাঃ) বনু হাশিমের জন্য যাকাত নিষিদ্ধ মর্মে ঘোষণা দিয়েছেন। (তিরমিযী) যাকাত আদায় করে সম্পদকে পরিচ্ছন্ন করা হয়। তাই মহানবী (সাঃ)-এর সাথে সম্পর্কের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে বনু হাশিম বংশের কোন সদস্য যাকাত সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিত হলে তার জন্যও যাকাত গ্রহণ করা বৈধ নয় বলে বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়েছেন।

রসূলে করীম (সাঃ) হযরত মু’আয (রাঃ) কে ইয়েমেনের গভর্ণর নিযুক্ত করে যাকাত সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছিলেন : “যাকাত মুসলিম ধনীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে গরীবদের মাঝে বিতরণ কর।” এর উপর ভিত্তি করেই ফকীহগণ বলেন যে, বিনা প্রয়োজনে এক স্থানের যাকাত অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়; বরং কোন স্থানের যাকাতের উপর সেই স্থানের অধিবাসীদের দাবী বেশী। তবে কারও গরীব আত্মীয়-স্বজন অন্যত্র বাস করলে সে নিজের যাকাত তাদেরকে পাঠাতে পারে। এতে গরীবকে সাহায্য করা ও আত্মীয়কে দান করা, এই দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যাবে মর্মে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) সুসংবাদ দিয়েছেন।

যে প্রকার সম্পদের যাকাত দেয়া ফরয সেই প্রকার সম্পদের অংশবিশেষ; অর্থাৎ, ব্যবসায়ের পণ্য, ক্ষেতের ফসল ইত্যাদির সুনির্দিষ্ট অংশ অথবা তার মূল্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে দান করলে যাকাত আদায় হয়ে যায়। দ্রব্য বা তার মূল্য উভয় প্রকারে যাকাত দেয়া যেতে পারে। তবে কোন কোন ফকীহ বর্তমানকালে নগদ টাকা-পয়সা দেওয়াকেই উত্তম বলে মত প্রকাশ করেছেন। কারণ, অভাবগ্রস্ত লোকের বিভিন্ন প্রকারের চাহিদা থাকে; আর নগদ অর্থকড়ি দিয়ে অনেক প্রকার অভাব পূরণ করা সম্ভব হয়।

দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনকে যাকাত দেয়া অত্যধিক সওয়াবের কাজ। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী, মাতা-পিতা, সন্তানাদি বা যাদেরকে ভরণ-পোষণ করা ওয়াজিব তাদেরকে যাকাত দেয়া যায় না।

যাকাত ভিক্ষাবৃত্তির অবসান ঘটাতে চায়। কাজেই একজন গরীবকে এই পরিমান দান করা উচিত যেন তাকে ভিক্ষা করতে না হয়। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণের পরিমাণ মতো যাকাত দেয়া যায়। এমনকি নিসাবের কম যেকোন পরিমাণ যাকাত তাকে দেয়া যেতে পারে। ফকীর-মিসকীনকে এক বৎসরের জীবিকার সমপরিমাণ যাকাত দেয়া যায়। (মিনহাজ)

যাকাত দিয়ে দিলেই দান করার সকল দায়িত্ব নিঃশেষ যায় এমন ধারণা ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামী জীবনব্যবস্থায় কেবল স্ত্রী, সন্তানাদিসহ নিজের স্বার্থরক্ষাই হয় না; বরং তাতে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ থেকে সমস্ত বিশ্ববাসীর প্রতি স্রষ্টা প্রদত্ত কর্তব্য পালন করা হয়। দানের হাত প্রসারিত না করলে এই সকল কর্তব্য পালন করা যায় না। এই জন্যই ইবাদত বন্দেগীর মধ্যে সালাত ও যাকাতের উপর পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত জোর দেয়া হয়েছে। সুতরাং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মুসলিম সবসময় সাধ্যমত দান করতে থাকে। বৎসরের শেষে একবার যাকাত পরিশোধ করেই দান-খয়রাতের যাবতীয় দায়িত্ব প্রতিপালিত হয়ে গেছে মনে করে হাত গুটিয়ে রাখা ঠিক নয়।

সাদাকাতুল ফিতরঃ
সাদাকাতুল ফিতরের প্রচলিত নাম ফিতরা। ফিতরা এক প্রকার যাকাত। পবিত্র রমযান মাসের শেষে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফিতরা ওয়াজিব। যাকাতের নিসাব ও ফিতরার নিসাব একইরূপ। তবে ফিতরার নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বৎসর অধিকারে থাকার প্রয়োজন হয় না। বসবাসের ঘর, ঘরের তৈজষপত্র, নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র, বইপত্র, কাপড়-চোপড়, আসবাবপত্র ও ঋণের অতিরিক্ত সম্পদের সর্বমোট মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা ৬১২.৩৫ গ্রাম রূপার সমান হলেই ফিতরা দিতে হয়, এর কম হলে নয়। ঈদের দিন নিসাব পরিমাণ সম্পদ অধিকারে থাকলেই ফিতরা ওয়াজিব হয়।

নিসাবের মালিকের উপর তার নিজের এবং তার নাবালিগ সন্তানাদির ফিতরা দেয়া ওয়াজিব। এমনকি ঈদের দিন সুবহে-সাদিকের পূর্বে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করে তারও ফিতরা ওয়াজিব। কিন্তু যে ব্যক্তি সুবহে-সাদিকের পূর্বে মারা যায় অথবা সুবহে- সাদিকের পরে ইসলাম গ্রহণ করে বা জন্ম নেয়, তার উপর ফিতরা ওয়াজিব নয়।

ফিতরার পরিমাণঃ
ফিতরা মাথাপিছু এক সা’ গম, যব, খেজুর, কিশমিশ অথবা পনির। শুধু গমের ক্ষেত্রে অর্ধ সা’-এর কথাও হাদীসে উল্লেখ আছে। ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ)-এর মতে এক সা’ ইরাক অঞ্চলের আট রতলের সমান। ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ), ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ), ইমাম মালিক (রহঃ), ইমাম শাফিঈ (রহঃ) ও ইমাম আহ’মদ (রহঃ)-এর মতে এক সা’ হিজায এলাকার পাঁচ সমস্ত তিন ভাগের এক রতলের সমান। দুররুল মুখ্তারের রচয়িতা বলেন, এক হিজাযী রতলে ত্রিশ ইস্তার এবং এক ইরাকী রতলে বিশ ইস্তার হওয়ায় উক্তরূপ মতবিরোধে পরিমাপে কোন পার্থক্য হয় না। উভয় ক্ষেত্রেই এক সা’তে ১৬০ ইস্তার হয়। তাই সর্বসম্মত ভাবে চার মুদে এক সা’ এবং ৬০ সা’তে এক ওসক হয়। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রচলিত ওজনে এক ইরাকী রতলে ৪৪২.২৫ গ্রাম এবং এক হিজাযী রতলে ৬৬৩.৪১ গ্রাম হয়। আর উভয় হিসাবেই এক সা’ সমান ৩৫৩৮ গ্রাম এবং আধা সা’ সমান ১৭৬৯ গ্রাম হয়।

ফিতরা আদায়ের নিয়মঃ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিক থেকে ফিতরা ওয়াজিব হয়। কোন ব্যক্তি এর আগে মারা গেলে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব থাকে না। ফিতরা গম, যব, খেজুর, কিশমিশ বা পনির দিয়ে দিতে হয়। এই পরিমাণের অন্য কোন খাদ্যদ্রব্য বা পণ্য দিলে ফিতরা আদায় হবে না। কিন্তু ১৭৬৯ গ্রাম গম অথবা ৩৫৩৮ গ্রাম যব, গম, খেজুর, কিশমিশ বা পনিরের মূল্য কিংবা ঐ মূল্যের অন্য কোন শস্য বা বস্ত্র ইত্যাদিও দেয়া যেতে পারে। নিকটবর্তী বাজারে ঐ সব খাদ্যবস্তু যে দরে পাওয়া যায় , সেই দরেই হিসাব করতে হবে। যাকাতের ন্যায় ফিতরাও পূর্বে বর্ণিত আটটি খাতে ব্যয় করা যায়। ঈদের দিনই ফিতরা আদায় করতে হয়। কিন্তু এর পূর্বে বা পরে দেওয়াও জায়েয আছে ।

ফিতরার গুরুত্বঃ
ফিতরা দ্বারা রমযানের সিয়ামের অনিচ্ছাকৃত ছোট-খাটো ত্রুটি-বিচ্যুতির ঘাটতি পূরণ হয় এবং ঈদের দিনে সমাজের দরিদ্র মুসলিমদেরও সাহায্য করা হয়। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, তোমরা ঈদের জামাতের আগে ফিতরা দিয়ে গরীবদেরকে ধনী বানিয়ে দাও। অর্থাৎ, তাদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নাও।

যাকাত আদায় না করার শাস্তিঃ
যাকাত ফরজ হওয়া সত্ত্বেও যারা যাকাত আদায় করে না তাদের সম্বন্ধে সূরা তাওবার ৩৪-৩৫নং আয়াতে আল্লাহ বলেন,“যে সব লোক সোনা-রূপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে না, তাদেরকে এক অতি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সেই দিন জাহান্নামের আগুনে সেই জমাকৃত সম্পদ উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে তাদের কপাল, তাদেও উভয় পাশ ও পিঠ দগ্ধ করতে করতে তাদেরকে বলা হবে, এইগুলোই তোমরা নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে; কাজেই এখন নিজেদের জমাকৃত সম্পদের স্বাদ উপভোগ কর।” রাসূলে কারীম (সাঃ) বলেছেন: যে জাতি যাকাত পরিশোধ করে না আল্লাহ তাদেরকে দুর্ভিক্ষে নিপতিত করেন। (জাম’উল-ফাওয়াইদ, ১ম খ-, পৃষ্ঠা ১৪৬)।

ইবন হাযম (রহঃ) আল-কুরআনের বহু আয়াত ও হাদীস উধৃত করে প্রমাণ করেছেন, প্রতিটি জনপদের ধনী ব্যক্তিদের আবশ্যিক কর্তব্য হলো সেই জনপদের নিঃস্ব হত- দরিদ্রদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহন করা। বায়তুল- মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সংরক্ষিত খাদ্যদ্রব্য ও ধন-সম্পদ গরীবদের অভাব মোচনের জন্যে যথেষ্ট না হলে রাষ্ট্রের কর্ণধার ধনীদের উপর অতিরিক্ত কর ধার্য করে তাদেরকে তাদের দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে পারবেন। (মুহাল্লা, ৬ খ-, পৃষ্ঠা ১৬৬)

(বিশ্ববিখ্যাত ফিক্হ গ্রন্থ আল-হিদায়া, দুররুল মুখতার, উমদাতুল ফিক্হ ও আসমারুল হিদায়া এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ প্রণীত ইসলামি বিশ্বকোষের যাকাতঅধ্যায় থেকে সংগৃহীত ও সংকলিত।)