যাকাত ও ফিতরার বিধান

জীবনযাত্রার অপরিহার্য ব্যয় নির্বাহের পর কোনো মুসলমানের নিকট যদি বছরকালব্যাপী নেসাব পরিমাণ (অর্থাত্ সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ কিংবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসায়ী) মালামাল থাকে তাহলে তার চল্লিশ ভাগের একভাগ আল্লাহ্র নির্দেশিত খাতে ব্যয় করার নাম যাকাত। এই যাকাত ধনীর তরফ থেকে গরীবের ওপর করুণা নয়; বরং এটা হচ্ছে গরীবের ন্যায্য অধিকার, খোদাপ্রদত্ত সম্পদে প্রভু কর্তৃক নির্ধারিত পাওনা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-‘আর বিত্তবানদের সম্পদে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের অধিকার রয়েছে।’ (সূরা জারিয়াত, আয়াত-১৯)

যে সম্পদের উপর যাকাত ফরয : (১) স্বর্ণ ও রূপা এবং সকল মুদ্রা। (২) বাহিমাতুল আনআম তথা চতুষ্পদ প্রাণী যেমন— উট, গরু, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা যেগুলো মুক্তভাবে বিচরণকারী। (৩) জমিন থেকে উত্পন্ন ফসল যেমন— শস্যদানা, ফল-ফলাদি ও খনিজ পদার্থ। (৪) ব্যবসায়ী সামগ্রী।

মুদ্রার যাকাত বের করার পদ্ধতি : বর্তমান যুগের মুদ্রাসমূহ যেমন— রিয়াল, ডলার, টাকা ইত্যাদির বিধান স্বর্ণ-রূপার বিধানের মতোই। বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতে এগুলো নির্ধারণ করতে হবে। মৌজুদ মুদ্রার পরিমাণ যখন স্বর্ণের বা রূপার মূল্যের সম পরিমাণ নেসাবে পৌঁছবে তখন তাতে যাকাত ফরয হবে। আর যাকাত আদায়ের পরিমাণ হচ্ছে ২.৫% ভাগ যখন পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হবে। যেমন ধরা যাক— বর্তমাণ বাজারে এক ভরি স্বর্ণের দাম ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার টাকা)। তাহলে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের দাম হবে ৩,৭৫,০০০/- (তিন লক্ষ পঁচাত্তর হাজার টাকা)। যার নিকট সর্ব নিম্ন এই টাকা থাকবে তাকে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করতে হবে। অর্থাত্, তাকে ৯,৩৭৫/- (নয় হাজার তিনশত পঁচাত্তর টাকা যাকাত দিতে হবে।

চতুষ্পদ প্রাণীর যাকাত : বাহিমাতুল আনআম— উট, গরু, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা এগুলোর যাকাতের দু’টি অবস্থা— (ক) যখন এ পশুগুলো একটি পূর্ণ বছর বা অধিকাংশ সময় বৈধ মরুভূমি বা খোলা মাঠে কিংবা চারণ ভূমিতে মুক্তভাবে বিচরণ করবে। বছর পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত নিসাবে বা পরিমাণে পৌঁছবে তখন তাতে যাকাত ফরয হবে। চাই তা দুধের জন্য বা বাচ্চা নেয়ার জন্য বা মোটাতাজা করণের জন্য হোক। প্রতিটি পশুর যে জাতি রয়েছে যাকাত তার জাতি দ্বারাই আদায় করতে হবে। যাকাত দেয়ার সময় সর্বোত্তম ও সর্বনিম্ন মানের পশুটি নেয়া যাবে না। বরং মধ্যমটি গ্রহণ করতে হবে। (খ) যখন এ পশুগলোর খাদ্য নিজের চারণভূমি বা ক্রয় করে ব্যবস্থা করা হবে। যদি এগুলো ব্যবসার নিয়তে ক্রয় করে আর তার উপর এক বছর অতিবাহিত হয় তবে বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে ২.৫% (আড়াই ভাগ) যাকাত দিতে হবে। আর যদি ব্যবসার জন্য না হয় বরং দুধ বা বাচ্চা দেয়ার জন্য হয় এবং পশু খাদ্যের ব্যবস্থা মালিককে করতে হয় তবে এতে কোনো যাকাত নেই।

জমিন থেকে উত্পন্ন ফসলের যাকাত : জমিন থেকে যা উত্পন্ন হয় যেমন— শস্যদানা, ফল-ফলাদি ও খনিজ পদার্থ। শস্যদানা ও ফল-ফলাদির যাকাত ফরয হওয়ার শর্তসমূহ— যাকাত ফরয হওয়ার সময় জমির মালিকানাভুক্ত হতে হবে আর উত্পন্ন ফসল নিসাব পরিমাণ হতে হবে। নিসাব হচ্ছে ৫ ওয়াসাক; এক ওয়াসাক সমান ৬০ সা’আ। তাহলে ৫–৬০=৩০০ সা’আ। এক সা’আ গমের পরিমাণ হচ্ছে ২.৪০ কেজি। তাহলে ৩০০–২.৪০=৬১২ কেজি নিসাব সমপরিমাণ।

ফসল যদি ‘উশরী জমিতে’ উত্পন্ন হয় অর্থাত্, কৃষকের বিনাখরচে বৃষ্টির পানি বা খাল-বিল ও নদীর সেচবিহীন পানি দ্বারা তাহলে এক-দশমাংশ (১০%) হারে যাকাত দিতে হবে। কিন্তু যদি ফসল ‘উশরী জমিতে’ উত্পন্ন না হয় অর্থাত্ কৃষক তা নিজস্ব সেচ দ্বারা উত্পাদন করেছে তাহলে এক-বিশমাংশ (৫%) হারে যাকাত দিতে হবে। আর যদি ফসল অর্ধেকটা বৃষ্টির পানি ও অর্ধেকটা সেচ দ্বারা উত্পন্ন হয়ে থাকে তাহলে তিন-দশমাংশ (৭.৫০%) হারে যাকাত দিতে হবে। ফসল কাটার পর হিসাব করে এ যাকাত প্রদান করতে হবে। যে সকল সবজি ও ফল গুদামজাত করা যায় না তার উপর যাকাত ফরয নয়। কিন্তু যদি তা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে এবং তার বিক্রিত মূল্য বছর অতিক্রম করে থাকে ও নিসাব পরিমাণ হয় তাহলে (২.৫০%) শতকরা আড়াই ভাগ হারে যাকাত প্রদান করতে হবে।

ব্যবসায়ী সামগ্রীর যাকাত : বেচা-কেনার উদ্দেশ্যে প্রস্তুতকৃত সামগ্রীকে ‘উরুযুত্ তিজারাহ’ বলা হয়। যেমন— খাদ্য, পানীয়, মেশিনপত্র ইত্যাদি। ব্যবসা সামগ্রীর যাকাতের বিধান হচ্ছে— ব্যবসা সামগ্রী যখন নিসাবে পৌঁছবে ও তার প্রতি এক বছর পূর্ণ হবে তখন তার উপর যাকাত ফরয হবে। বছর পূর্ণ হলে স্বর্ণের বা রূপার যে নিসাব সে হিসেবে সমস্ত বিক্রয় মূল্য অথবা ব্যবসায়িক পণ্য থেকে ২.৫০% আড়াই ভাগ যাকাত নির্ধারণ করতে হবে।

যাকাত পাবার প্রকৃত হকদার কারা : যাকাত পাবার হকদার সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-‘যাকাত তো শুধু তাদের হক যারা গরীব, মিসকিন, যারা যাকাত আদায়ের কাজে নিযুক্ত, যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন, এবং দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য— এটা আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ হেকমতওয়ালা।’ (সূরা তাওবা, আয়াত, ৬০)।

অন্যদিকে ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী ছাড়া যে ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবেন তার জন্য সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ঈদের দিন ফজরের নামাযের পূর্বে যদি কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করে তাহলে তার পক্ষ থেকে অভিভাবক সাদকাতুল ফিতর আদায় করবেন। ফিতরা আদায় করতে হবে ঈদের নামাযে যাওয়ার পূর্বে। ঈদের নামাযের পরে দিলেও তা আদায় হবে; তবে এটা উত্তম নয়। আমাদের দেশে প্রতিবছর ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফিতরার পরিমাণ ধার্য করে থাকেন। এ বছর জনপ্রতি সর্বনিম্ন ফিতরা ৭০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১,৯৮০ টাকা ধার্য করা হয়েছে।

লেখক: আজিমপুর দায়রা শরীফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন পীর ও মুতাওয়াল্লী

লেখক: শাহ্ সূফী সাইয়্যেদ আহমাদুল্লাহ্ যোবায়ের |

উৎস: দৈনিক ইত্তেফাক

প্রকাশ : ৩১ মে, ২০১৯