দারিদ্র্যবিমোচনে জাকাত- ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।

জাকাত ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান এবং ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘জাকাত’-এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পবিত্রকরণ ও বর্ধিতকরণ। জাকাত মানুষকে কৃপণতার কলুষ থেকে মুক্তি দেয়। সম্পদের একটি অংশ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষকে দান করার মাধ্যমে সম্পদের বাকি অংশকে পবিত্র করা হয় বলে এর নাম জাকাত। নিয়মিত জাকাত প্রদানের ফলে সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় জাকাত প্রদানের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং ২৬ জায়গায় সালাতের পাশাপাশি জাকাতের উল্লেখ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যে ব্যক্তি সালাত আদায় করে অথচ জাকাত আদায় করে না, সে মুসলমান নয় এবং তার আমল তার কোনো উপকারে আসবে না। জাকাত যারা আদায় করেন তারা জান্নাতি। যারা জাকাত অস্বীকার করে তারা মুমিন নয়। জাকাতে বিশ্বাস করে কিন্তু আদায় করে না তারা মুনাফিক। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা জাকাত প্রদানে বিরত থাকে তাদের জন্য রয়েছে আখেরাতে কঠোর ও ভয়াবহ শাস্তি। মহানবী সা: ঘোষণা করেন, সাধ্যানুসারে দরিদ্র লোকদের দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষুধার্তকে অন্ন দান এবং বস্ত্রহীনকে বস্ত্রের সংস্থান করার জন্য আল্লাহ তায়ালা বিত্তবান মুসলমানদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন। সাবধান! আল্লাহ তাদের কঠোর হিসাব নেবেন এবং প্রদান করবেন মর্মন্তুদ শাস্তি (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব, ১ খণ্ড, পৃ. ৫৩২)। মহানবী সা:-এর কাছে কেউ জাকাত নিয়ে এলে তিনি দোয়া করতেন- ‘হে আল্লাহ! তুমি তার প্রতি দয়া করো।’ (মিশকাত, হাদিস নং ১৬৮৫)।

সামর্থ্যবানদের মধ্যে যারা জাকাত আদায় করে না তাদের জন্য বীভৎস শাস্তি নির্ধারিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা সোনা-রুপা জমা করে, অথচ আল্লাহর রাস্তায় তা খরচ করে না (অর্থাৎ জাকাত দেয় না) তাদের সংবাদ দিন কষ্টদায়ক আজাবের, যেদিন গরম করা হবে সেগুলোকে দোজখের আগুনে, অতঃপর দাগ দেয়া হবে সেগুলো দ্বারা তাদের ললাটে, তাদের পার্শ্বদেশে ও তাদের পৃষ্ঠদেশে (এবং বলা হবে,) এখন স্বাদ গ্রহণ করো এর, যা তোমরা (দুনিয়াতে) জমা করেছিলে (সূরা তাওবাহ : ৩৪-৩৫)। মহানবী সা: বলেন, আল্লাহ যাকে সম্পদ দান করেন, আর সে এর জাকাত আদায় করে না, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার সম্পদকে মাথায় টাক পড়া সাপ বানিয়ে দেবেন, যার চেখের ওপর দুটো কালো দাগ থাকবে। এ সাপ তার গলায় বেড়িস্বরূপ করা হবে, মুখের দুই দিকে তাকে দংশন করতে থাকবে এবং বলবে- ‘আমি তোমার সম্পদ। আমি তোমার সঞ্চিত অর্থ।’(সহি বুখারি, হাদিস নং ১৩১৮)।

প্রতিটি ‘সাহেবে নিসাব’ মানুষের ওপর জাকাত ফরজ। ‘সাহেবে নিসাব’ বলা হয় যার নিকট সারা বছরের খাওয়া, দাওয়া ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের পর বছরান্তে সাড়ে সাত তোলা সোনা (৮৫ গ্রাম) বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা (৫৯৫ গ্রাম) বা সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা ব্যবসার পণ্য অবশিষ্ট থাকবে তার ওপর শতকরা আড়াই টাকা হারে জাকাত প্রদান করা ফরজ হবে। অলঙ্কারসহ সব ধরনের সোনা-রুপার জাকাত দিতে হবে। হাদিসে বর্ণিত আছে, একবার দু’জন মহিলা রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে এলো, তাদের দু’জনের হাতে ছিল স্বর্ণের বালা। তখন রাসূল সা: তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি তোমাদের অলঙ্কারের জাকাত দাও?’ তারা বলল, ‘না।’ তখন মহানবী সা: বললেন, ‘তোমরা কি পছন্দ করবে যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে আগুনের দু’টি বালা পরিয়ে দেবেন?’ তারা দু’জন বলল, না। তখন রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, তাহলে তোমরা এ স্বর্ণের জাকাত প্রদান করো।’ (জামে’ তিরিমিজি)।

নাবালক, বিকৃত মস্তিষ্ক, অমুসলিম, ঋণগ্রস্ত ও ক্রীতদাসের ওপর জাকাত ফরজ নয়। পবিত্র কুরআনের বর্ণনানুযায়ী ফকির, মিসকিন, জাকাত সংগ্রহকারী, মুয়াল্লাফাতুল কুলুব, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথের মুজাহিদ এবং মুসাফিরকে জাকাত দেয়া যাবে। এটা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ (সূরা তাওবা : ৬০)। শরিয়তের পরিভাষায় ‘মুয়াল্লাফাতুল কুলুব’ বলা হয় ইসলামের পক্ষে যাদের মন জয় করা আবশ্যক। কিছু গবেষকের মতে, ইসলাম বিজয়ী শক্তি রূপে আবির্ভূত হওয়ার পর ‘মুয়াল্লাফাতুল কুলুব’কে জাকাত দেয়ার প্রথা রহিত হয়ে গেছে। কারো কারো মতে, প্রয়োজন দেখা দিলে এখনো এ নিয়ম চালু করা যেতে পারে (তাফসির ইবনে কাসির, ৩ খণ্ড, পৃ. ১৩১০)।

মৌলিক ও নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রীর ওপর জাকাত নেই। বসবাসের ঘর, পেশাগত সামগ্রী অর্থাৎ মুফতি, মুহাদ্দিস ও ফকিহদের বিপুল গ্রন্থ, শরাহ শরুহাত, আইনজীবীদের আইনের বই, ল রিপোর্ট, সংবাদকর্মীদের রেফারেন্স জার্নাল এবং চিকিৎসকদের Medical appliances, শিল্পকারখানর যন্ত্রপাতি, ব্যবহারের গাড়ি-বাড়ি, নৌযান, আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রীর ওপর জাকাত নেই। তবে কেউ যদি হাউজিং বিজনেস, অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করে বা গাড়ির ব্যবসা করে, তার ওপর জাকাত ওয়াজিব।

‘বিক্রির উদ্দেশ্যে খামারে পালিত মৎস্য, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল ইত্যাদি এবং খামারে উৎপাদিত দুধ, ডিম, ফুটানো বাচ্চা, মাছের রেণু-পোনা ইত্যাদির ব্যবসার সম্পদ হিসেবে জাকাত প্রদান করতে হবে। বিক্রির উদ্দেশ্যে নার্সারির বীজ, চারা, কলম ইত্যাদির ব্যবসার সম্পদ হিসেবে জাকাত প্রদান করতে হবে। ভাড়ায় নিয়োজিত ঘরবাড়ি, দালানকোঠা ইত্যাদি বার্ষিক ভাড়াবাবদ উপার্জিত নিট আয়ের ওপর জাকাত প্রদান করতে হবে। ব্যবসার দেনা, যেমন বাকিতে মালামাল বা কাঁচামাল ক্রয় করলে কিংবা বেতন মজুরি, ভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, কর ইত্যাদি পরিশোধিত না থাকলে ওই পরিমাণ অর্থ জাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বাদ যাবে। অন্য দিকে বাকি বিক্রির পাওনা, মালামাল বা কাঁচামাল ক্রয়ের উদ্দেশ্যে অগ্রিম প্রদান, এলসি মার্জিন ও আনুষঙ্গিক খরচ, ফেরতযোগ্য জামানত, ভাড়ার বিপরীতে অগ্রিম ইত্যাদি জাকাতের হিসাবে আনতে হবে। বিক্রয়কারী তার বিক্রিযোগ্য মালামালের ক্রয় খরচ মূল্যের ওপর এবং উৎপাদনকারী তার উৎপাদিত মালামালের উৎপাদন খরচ মূল্যের ওপর জাকাত হিসাব করবে। (যাকাতের বিধি বিধান : ইসলামের নির্দেশনা, শরিয়াহ বোর্ড সেক্রেটারিয়েট, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, মাসিক আত-তাওহীদ, চট্টগ্রাম, জুলাই ’১২)।

Platinum, Diamond বা White Gold সম্পদ হিসেবে জমা রাখলে এগুলোর জাকাত দিতে হবে। নগদ অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, প্রাইজবন্ড, বীমা পলিসির ওপর জাকাত দিতে হবে। Provident Fund-এর জাকাত দিতে হবে, যদি অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় (Debit-Credit) হিসাবধারীর স্বাধীনতা থাকে এবং কর্তৃপক্ষের কোনো বিধিনিষেধ না থাকে। যেসব Provident Fund-এর অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধ থাকে, সেসব ক্ষেত্রে ফান্ডের টাকা হাতে আসার এক বছর পর জাকাত প্রদান করতে হবে। অনুরূপভাবে পেনশনের টাকাও হাতে পেলে বছরান্তে জাকাত দিতে হবে।

গবাদি পশুর জাকাত ফরজ যদি ঘাস, পানি, খৈল, ভুসি দেয়া ব্যতীত এগুলো মাঠে বিচরণ করে প্রতিপালিত হয় এবং গৃহস্থালির কাজের অতিরিক্ত, বিক্রির জন্য অথবা দুধ ও বংশ বৃদ্ধির জন্য হয়। পাঁচটি উটের জন্য একটি ছাগল, ৩০টি গরু-মহিষের জন্য এক বছর বয়সী একটি বাছুর, ৪০-১২০টি ছাগলের জন্য একটি ছাগল ও প্রতিটি ঘোড়ার জন্য ১ দিনার হারে জাকাত দিতে হবে। চাষাবাদ ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত গবাদি পশুর জাকাত নেই। (মুয়াত্তা মালেক, ১ খণ্ড, পৃ. ৩২৬-৭)।

‘আপন দরিদ্র পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী তথা ঊর্ধ্বস্থ সব নারী-পুরুষ অনুরূপ ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনী ও অধস্তন সব নারী-পুরুষ এবং স্বামী-স্ত্রীকে জাকাত প্রদান করা জায়েজ নেই। জাকাতবহির্ভূত সম্পদের দ্বারা তাদের ভরণপোষণ করা ওয়াজিব। অনুরূপভাবে হজরত মুহাম্মদ সা:-এর প্রকৃত বংশধরদের সম্মান ও মর্যাদার কারণে জাকাতের অর্থ দ্বারা সাহায্য করা জায়েজ নেই। একমাত্র দানের অর্থ দ্বারাই তাদের খেদমত করা জরুরি। মসজিদ, মাদরাসা, রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মাণের জন্য জাকাতের অর্থ ব্যয় করা নিষেধ। সাধারণ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করাও জায়েজ নয়। তবে আশ্রয় কেন্দ্রে দুরবস্থাসম্পন্ন আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যক্তি মালিকানাধীন ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দেয়া জায়েজ। মনে রাখতে হবে জাকাত পরিশোধ হওয়ার জন্য ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে দেয়া শর্ত। সুতরাং জাকাতের অর্থে মৃতব্যক্তির দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করাও জায়েজ নেই। জাকাত দেয়া যেমন শরিয়তের বিধান, অনুরূপ জাকাত পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিকেই জাকাত দেয়া শরিয়তের বিধান। সঠিক পাত্রে জাকাত প্রদান না করলে জাকাত পরিশোধ হবে না।’ (যাকাতের বিধিবিধান : ইসলামের নির্দেশনা, শরিয়াহ বোর্ড সেক্রেটারিয়েট, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, মাসিক আত-তাওহীদ, চট্টগ্রাম, জুলাই ’১২)।

জাকাত প্রদানের মাধ্যমে সম্পদের ধারাক্রম কেবল ধনীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়ে সমাজের নিম্নস্তর পর্যন্ত প্রবাহিত হয়। ফলে পুঁজিবাদের অবসান ঘটে, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, দারিদ্র্যসহনীয় মাত্রায় পৌঁছে। জাকাত দরিদ্রদের প্রতি কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। ধনীদের সম্পদে রয়েছে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের হক। হজরত উমর ইবনে খাত্তাব রা:, ইমাম আবু হানিফা রহ:, ইমাম মালিক রহ: ও আল্লামা ইউসুফ কারযাভির মতে, জাকাত প্রদানের একটি নিয়ম আছে অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে সমাজের নিঃস্ব, দরিদ্র, অনাথ ও পীড়িত মানুষকে চিহ্নিত করে সংগৃহীত জাকাত একমুঠোই তাদের প্রদান করা হলে তারা ওই অর্থ দিয়ে ব্যবসা, পশুপালন, সেলাই মেশিন ক্রয় বা অন্য কোনো লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে দারিদ্র্য ঘুচাতে পারে এবং স্বল্প সময়ের ব্যবধানে জাকাত গ্রহণকারীরাই জাকাত প্রদানে সক্ষম হবে। তবে এ কথাও জানা দরকার, জাকাতের অর্থ ছোট ছোট অংশে ভাগ করে একাধিক ব্যক্তির মধ্যে বণ্টন করলেও জাকাত আদায় হয়ে যাবে।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির দেয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশ পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশে চার কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ছয় কোটি ৪০ লাখ মানুষের কোনো চাকরি নেই। এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের কারণে দিশেহারা। মা-বাবার আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তিন লাখ ৩০ হাজার শিশু স্কুলে যেতে পারে না। পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ শিশু মাঝারি থেকে মারাত্মক পুষ্টিহীনতার শিকার। উল্লেখ্য, যাদের আয় দৈনিক ১.২৫ ডলারের চেয়েও কম, বিশ্বব্যাংক তাদের চরম দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। (WFP.org/Countries Bangladesh;UNICEF.org/ Bangladesh; Wikipedia, poverty)

বাংলাদেশে ১৫ লাখ পরিবার নিঃস্ব, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। ৩০ লাখ পরিবার আছে যাদের ভিটা আছে, কিন্তু ১ শতক জমি নেই সবজি চাষের। দুই কোটি শিক্ষিত মানুষ বেকার। কয়েক শ’ আছেন যাদের সম্পদের পরিমাণ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। এ দেশের বিত্তবানরা যদি জাকাত দেন তাহলে বছরে কমপক্ষে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার মতো জাকাত আদায় সম্ভব। এ বিপুল অর্থ পরিকল্পনামাফিক বিনিয়োগ ও বণ্টনের ব্যবস্থা করলে কয়েক বছরের মধ্যে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পাবে। স্মর্তব্য, বাংলাদেশের বিত্তশালীদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জাকাত প্রদান করে না; দিলেও তা সামান্য। জাকাত প্রদানকারীদের মধ্যে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে জাকাত দেন, এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম। জাকাত আহরণ ও বিতরণের সুষ্ঠু কোনো পদ্ধতি বা নীতিমালা নেই। ফলে দারিদ্র্যবিমোচনের সুফল থেকে আমরা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছি।

দারিদ্র্য মূলত অভিশাপ। অভাবে মানুষের স্বভাব নষ্ট হয়। অভাব অনেক সময় মানুষকে কুফরি ও নাফরমানির দিকে ঠেলে দেয়। দারিদ্র্যের কারণেই সমাজে নানাবিধ পাপকাজ যেমন- চুরি-ডাকাতি, চাঁদাবাজি, হত্যা, সন্ত্রাস, অপহরণসহ বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম সংঘটিত হয়ে থাকে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের ব্যবস্থা করলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য বিদায় নেবে; নিশ্চিত হবে সামাজিক নিরাপত্তা। সমাজের দুঃখী ও দারিদ্র্যক্লিষ্ট জনগোষ্ঠী জাকাতের উপকারভোগী (Beneficiary)। জাকাতের অর্থ সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কেবল অভাব পূরণে সহায়তা করে না বরং বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে। ফলে সমাজে ধনী-দরিদ্রদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহানুভূতির গুণাবলি বৃদ্ধি পায়। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে- ‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সৎ কাজ করেছে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং জাকাত প্রদান করেছে, তাদের জন্য পুরস্কার তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।’ (সূরা বাকারা : ২৭৭)।

ইসলামের সোনালি যুগে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ করা হতো। হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ:-এর শাসনামলে মিসরে জাকাত গ্রহণকারী পাওয়া যায়নি। ইসলামের আলোকে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের ফলে জাকাতদাতা ছিল, জাকাতগ্রহীতা ছিল না। ইতিহাসে এরূপ প্রমাণ আরো আছে। ইমাম মালেক রহ:-এর মতে, জাকাতের সম্পদ বিতরণের বিষয়টি ইসলামী সরকারের বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল। যারা হতদরিদ্র বা যেসব এলাকায় অভাবী মানুষের সংখ্যা অধিক, সরকার যত দিন প্রয়োজন মনে করবে তাদের মধ্যে জাকাত বণ্টন অব্যাহত রাখবে। (মুয়াত্তা মালেক, ১ খণ্ড, পৃ.৩৩৪)। এখনো সৌদি আরবে সরকারিভাবে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের ব্যবস্থা আছে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি জাকাত বোর্ড থাকলেও তার কার্যক্রম কিন্তু অত্যন্ত সীমিত। দেশের বিজ্ঞ আলিম ও মুফতিদের সমন্বয়ে জাকাত বোর্ড পুনর্গঠন করা দরকার। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জাকাত সংগ্রহ করে বাস্তুহারা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষত মাদরাসা, এতিমখানা ও অনাথ আশ্রমের দুস্থ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণের ব্যবস্থা করলে এক দিকে শিক্ষার আলো যেমন ছড়াবে তেমনি অপর দিকে আলেম-উলামাদের ধনীদের দুয়ারে যেতে হবে না। তারা অহর্নিশ জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত থাকার সুযোগ পাবেন। এভাবে জাকাতচর্চার মাধ্যমে একটি দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

লেখক :ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ওমর গণি এম ই এস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম।

উৎস: দৈনিক নয়াদিগন্ত

প্রকাশ :২৫ ডিসেম্বর ২০১৯,