উম্মাহর মূল সমস্যা : আমাদের করণীয়।- শাহ্ আব্দুল হান্নান

বর্তমান বিশ্ব আজ গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত করছে। সমস্যা আর সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। সে ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর কয়েকটি এখানে তুলে ধরা দরকার, যাতে বিষয়গুলো নিয়ে সবাই ভাবতে পারেন।

আজ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন রয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা। বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর সমস্যা ইসলামের দৃষ্টিতে সমাধানের জন্য আলেম ও চিন্তাবিদদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কেননা, আলেমরা সাধারণত শরিয়াহর বৈধতা-অবৈধতার বিষয়ে ভালো জানেন। অন্য দিকে, মুফাক্কির বা চিন্তাবিদরা শরিয়াহর বিষয়ে এবং ফিকাহ-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে পূর্ণ জ্ঞান না রাখলেও চিন্তার ক্ষেত্রে অগ্রসর। তারা মুসলিম বিশ্বের, মুসলিম উম্মাহর সমস্যা নিয়ে চিন্তা করেন, গভীরভাবে ভাবেন। এসব লোকের মতামত আলেমদের প্রয়োজন। অপর দিকে, তাদেরও আলেমদের মতামত গ্রহণ প্রয়োজন। আল্লামা ইকবালকে আমরা আলেম বলি না, বলি মুফাক্কিরে ইসলাম। তিনি

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত চিন্তাবিদ আবদুল হামিদ আবু সুলেমানের কথা বলা যায়। তিনি বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে যে ব্যাপক ক্রাইসিস রয়েছে সে সম্পর্কে বলেছেন। গত ১০-১৫ বছরের তুলনায় আজকের দিনে সমস্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট-এর সাথে জড়িত। তিনি তার ‘ক্রাইসিস অব দি মুসলিম মাইন্ড’ বইয়ে লিখেছেন, পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়, মুসলিম জনগণের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর সেটি করা হলে তা অনুকরণ করা ছাড়া আর কিছুই হবে না। অনুকরণ করে কোনো জাতি বা কেউ বড় হতে পারে না। তারা বিশ্বব্যাপী লিডার হতে পারে না।

হাজার বারো শ’ বছর আগের সমাজ কিংবা অতীতের আব্বাসীয়-উমাইয়া সময়ে যেভাবে চিন্তাবিদরা, ফিকাহবিদরা সমস্যা সমাধান করেছেন আমরা সেভাবে সমাধান করি- এটি একটি মত। কিন্তু তিনি বলেছেন, সত্যিকার অর্থে সেটি সম্ভব নয়। সমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, যোগাযোগের এমন পরিবর্তন হয়েছে যে, আগে যেভাবে সমস্যার সমাধান করা হয়েছিল তাদের যুগে, আমাদের সময়ে পূর্বসূরিদের সেসব অনুসরণের মধ্যে সব সমাধান নেই। তার মতে, আজকের যুগে নতুন করে কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে সমস্যার সমাধান করতে হবে। মুসলিম উম্মাহর সমস্যাগুলো বুঝে, ইসলামকে সামনে রেখে, আমাদের মেধা দিয়ে তা সমাধান করতে হবে। এটিই সবচেয়ে সঠিক পদ্ধতি বলে তিনি বর্ণনা করেছেন।

আজকের দিনে আমাদের দেশে সমস্যা অনেক। অন্যতম প্রধান সমস্যা দারিদ্র্য। দারিদ্র্য দূর করা একটি কঠিন কাজ। আমরা যেন এটিকে একটি সহজ কাজ বলে মনে না করি। এটিকে এভাবে সরলীকরণ করা হয় যে, জাকাত প্রতিষ্ঠা করে দাও, সব অভাব দূর হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি তা নয়। আমি আমার ‘দারিদ্র্য বিমোচন : ইসলামের কৌশল’ লেখায় বলেছি, আমাদের দারিদ্র্য দূর করতে গেলে এক দিকে যেমন জাকাত প্রতিষ্ঠা করতে হবে, ওয়াক্ফকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, তেমনিভাবে আমাদের মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, ব্যাংকিং নীতিসহ সব কিছু ব্যবহার করতে হবে, সমন্বয় করতে হবে।

এর পরের সমস্যা খুব বড় ধরনের। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা। আমাদের ইসলামের আলোকে উন্নত ধরনের একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামের প্রয়োজন পূরণ করছে না। এ জন্য তা সংস্কার করতে হবে। এ ব্যাপারে মালয়েশিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানসহ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে সংস্কারপদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে তা দেখতে হবে। সেখানে আধুনিক বিষয়ে শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি তাদের কতগুলো ইসলামী বিষয়ের ওপর কোর্স করতে হয়। এর মধ্যে আছে কুরআন, ইসলামিক স্টাডিজ, ফিকাহ, আরবি ভাষা, ইসলামী অর্থনীতি, ইসলামের রাজনীতিসহ আরো বেশ কিছু কোর্স। ফলে ছাত্রদের সেখানে নিজেদের মূল বিষয়ের সাথে সাথে ইসলামের প্রয়োজনীয় জ্ঞান দেয়া হয়। এভাবে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

নারী অধিকারের বিষয়টি একটি বড় ব্যাপার। অনেক বড় আলেমই নারীর অধিকারের কথা বলেছেন। ড. ইউসুফ আল কারযাভী, ড. জামাল বাদাবি, আবদুল হালিম আবু শুক্কাহ, ড. হাসান তুরাবির মতো বড় বড় আলেমের নাম উল্লেখ করা যায়, যারা বলেছেন, নারীকে মর্যাদা না দিলে ইসলামের অগ্রগতি হবে না। অর্ধেককে পেছনে রেখে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। তারা ইসলামের সাথে নারীকে সম্পৃক্ত করার কথা বলেছেন, তাদের সব অধিকার দেয়ার কথা বলেছেন। নারীদের মসজিদে যাওয়া নিয়ে এখনো বিতর্ক অনেক বেশি। কাজেই নারীদের সমস্যা আমাদের বুঝতে হবে এবং তাদের এগিয়ে নিতে আলেমদের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে সমাজের সব মহলকে এসব সমস্যা সমাধানে চিন্তা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

উৎস: দৈনিক নয়াদিগন্ত

প্রকাশ :১৯ ডিসেম্বর ২০১৯,